গণমানুষের প্রত্যাশিত ঘোষণাপত্র

‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ প্রকাশ নিয়ে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের অনৈক্য দেখা যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন বাহাত্তরের সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত শাসনতন্ত্র। এটা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। ঘোষণাপত্র বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে,  ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে লিফলেট বিতরণ, সমাবেশ ও গণসংযোগ করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণায় কী আসতে পারে, আদৌ তাতে জনমানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে কি না এ নিয়ে রয়েছে কিছুটা অস্পষ্টতা। ২৯ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ৩১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার বেলা ৩টায় জুলাই বিপ্লবের ‘ঘোষণাপত্র’  দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ঘোষণাপত্রে ‘নাৎসিবাদী আওয়ামী লীগকে’ বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করা হবে এবং মুজিববাদী সংবিধান কবরস্থ করা হবে। কিন্তু এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে বিএনপি। যে কারণে বিপ্লবের  ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে গিয়েও পিছু হটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত শাসনতন্ত্র। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এটি অর্জন করেছি আমরা। কেউ এটি অপব্যবহার করলে সংশোধন করে যুগোপযোগী করা যাবে। কিন্তু বাতিল করার প্রশ্ন আসছে কেন?’

১৫ জানুয়ারির মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র (প্রক্লেমেশন) পাঠ করতে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব  দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ অংশগ্রহণকারী সব শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দল ও পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করা হবে। এতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিত, ঐক্যের ভিত্তি ও জনগণের অভিপ্রায় ব্যক্ত হবে। আমরা আশা করছি, সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে কিছুদিনের মধ্যেই সর্বসম্মতিক্রমে এ  ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করে তা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘ঘোষণাপত্রের খসড়া তৈরি বা এর  ডেভেলপমেন্ট কতদূর, এ নিয়ে আমরা বেশ কিছু ফোনকল পেয়েছি। শুধু এটুকু বলতে পারি, এটি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে এবং সামনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথাবার্তা হবে। আমরা আশা করছি সামনে এর ডেভেলপমেন্ট দেখা যাবে।’ প্রেস সচিব জানান, ‘জুলাই ঘোষণাপত্রের ব্যাপারে আমরা আমাদের অ্যানাউন্সমেন্টে বলেছিলাম, কিছুদিনের মধ্যে ঘোষণা করা হবে। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।  তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে এখনো দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়নি।’ এ বিষয়ে সোমবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

জনমনে প্রশ্ন, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র নিয়ে কী হচ্ছে? আদৌ কি সরকার এ  ঘোষণা দেবে? হলেও কীভাবে? বিএনপি কি তাতে সায় দেবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীনতার ঘোষণার পর ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল একটি ঘোষণাপত্র  দেওয়া হয়। সেটির ওপর ভিত্তি করে সংবিধান প্রণয়নের আগ পর্যন্ত দেশ পরিচালনা হয়েছে। সেই নজিরের ওপর ভিত্তি করে এবারও সেটি করা যায়। তবে তা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া সমীচীন হবে। সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, ‘ঘোষণাপত্রে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের অভিপ্রায় পূরণের অঙ্গীকার থাকতে হবে, সংগ্রাম-লড়াইয়ের প্রেক্ষিত উল্লেখ থাকতে হবে।’ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেছেন, ‘ঘোষণাপত্র আগে তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধে ঘোষণা পাঠ হয়েছে, ঘোষণা হয়েছে, তারপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এখন জুলাই অভ্যুত্থানের কী ঘোষণা দেওয়া হবে, তা আমার মাথায় কাজ করছে না। কথাবার্তায় যা মনে হচ্ছে, তাতে বিষয়টা অস্পষ্ট। এই অস্পষ্ট বিষয় কেন সামনে আসছে তা আমার বোধগম্য নয়।’ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, ‘আমি এটাকে বিপ্লব বলছি না। এটা জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের  ঘোষণা। অভ্যুত্থানের পর ঘোষণা করলে যে আবেদন ছিল, সাড়ে চার মাস বা পাঁচ মাস পর সেই আবেদন অনেকখানি ফিকে হয়ে গেছে। তারপরও যদি এটা করা যায় খারাপ হবে না। সেদিক থেকে রাজনৈতিক দল, ছাত্র, তরুণসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে কথা বলে সবার মতামতের ভিত্তিতে ঘোষণা তৈরি করা যেতে পারে।’

ঘোষণাপত্রে গণমানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন থাকুক, একাত্তরের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকুক এটাই চাওয়া। এ বিষয়ে কোনো পক্ষের মধ্যেই দ্বিমত থাকা ঠিক হবে না। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতৃবৃন্দের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে যেন বিষয়টির সমাপ্তি হয়।