গণ-অভ্যুত্থানে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা

আমাদের ভূখণ্ডে তিনটি পৃথক গণ-অভ্যুত্থান দেখার সুযোগ হয়েছে। ঊনসত্তর, নব্বই এবং চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান। তিনটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে যেমন অমিল রয়েছে, তেমনি রয়েছে মিল। আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান নিশ্চয় মাইলফলক। কিন্তু ত্যাগ-আত্মত্যাগে গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পরিণতি হয়েছিলও কেবল স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতন এবং নতুন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতাগ্রহণ। নতুন সামরিক শাসক নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ওই আন্দোলন আর এগোয়নি। নির্বাচনী ডামাডোলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। সত্তরের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ অর্থাৎ বাঙালিদের কাছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তরে অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি মোটেও সম্মত ছিল না। নানা টালবাহানায় তারা সময়ক্ষেপণ করে গণহত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং একাত্তরের ২৫ মার্চ বাস্তবায়ন করে পরিকল্পিত গণহত্যা। আক্রান্ত দিক-দিশাহীন বাঙালিদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে দ্রুত। প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং প্রতিবেশী দেশের সাহায্য-সহযোগিতায় গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ। এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। গেরিলা আক্রমণ ও সম্মুখ সমরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে নাজেহাল করে তোলে মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধ চলে নয় মাসব্যাপী। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান অতর্কিতে ভারত আক্রমণ করলে দুই দেশের যুদ্ধ শুরু হয়। ওই যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রথম বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। এর আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢোকেনি। শুরু হয় স্থল ও বিমান আক্রমণ। আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানোর পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চল প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। তবে শর্ত আরোপ করে তারা মুক্তিবাহিনী নয়, ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। আসেল মূল কারণ ছিল, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধে লিপ্ত দুই দেশ যদি কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী হয়, তাহলে শর্ত রয়েছে আত্মসমর্পণকারী দেশের কোনো সৈন্যকে হত্যা করা যাবে না। কিন্তু সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সেই আইনের বাইরে। মুক্তিবাহিনী হাজার হাজার সৈন্য হত্যা করলেও, কোনো সমস্যা হতো না। সেই ভয়টা পাকিস্তানের ছিল। মূলত এ কারণেই তারা ভারতকে বেছে নেয়। এরপর একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সম্পন্ন হয় পাকিস্তানের পক্ষে নিয়াজির আত্মসমর্পণ।

স্বাধীন দেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রক্তক্ষয়ী সেনা বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ হারান রাষ্ট্রপ্রধান ও তার পরিবার। পঁচাত্তর থেকে নব্বই এই দীর্ঘ সময়ে দেশে সামরিক সরকারেরা ক্ষমতা দখল-পাল্টাদখলের মধ্য দিয়ে পোশাক বদল করে ক্ষমতায় থাকে। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের পতন হয় নব্বই গণ-অভ্যুত্থানে। সেনাবাহিনী জেনারেল এরশাদের পক্ষ ত্যাগ করার ফলেই মূলত এরশাদের পক্ষে আর ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হয়নি। সেনাবাহিনী যদি আইয়ুব এবং এরশাদের পক্ষ ত্যাগ না করত তবে তাদের পতন গণ-অভ্যুত্থানে হতো কি না এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তিন দফায় আওয়ামী লীগ দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে তামাশায় পরিণত করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলসহ আখেরাত অবধি ক্ষমতায় থাকার জন্য চরম স্বৈরাচারী পন্থা অবলম্বন করে। গণতান্ত্রিক সব অধিকার হরণ করে দীর্ঘ ১৬ বছর নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছিল তারা। পরিণতি জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান। সরকার পতনের পর সেনাপ্রধান সব দায়িত্ব গ্রহণ এবং তার প্রতি আস্থা রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। দেশ কার্যত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ এবং প্রকাশ্যে ক্ষমতা গ্রহণ না করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে ভূমিকা পালন করে। পরিবর্তিত এ সময় আমাদের সামনে তিন ধরনের ক্ষমতাবানদের আমরা দেখছি। একটি অপ্রত্যক্ষে থাকা সেনাবাহিনী, অন্তর্বর্তী সরকার এবং আন্দোলনকারী সমন্বয়ক। প্রকৃতপক্ষে দেশ কাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। কেননা তিন পক্ষেরই এখানে কর্তৃত্ব রয়েছে।

আমাদের দেশে প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে বিভিন্ন জাতীয় নির্ধারিত বিষয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা নতুন কিছু নয়। ভাস্কর্য শিল্পের বিরুদ্ধে মৌলবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা অতীতেও লক্ষ্য করা গেছে। ভাস্কর্য ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তখন সফল না হলেও এরশাদের সামরিক শাসনের শুরুর দিকে গুলিস্তানে এবং শিশু একাডেমির ‘দুরন্ত’ ভাস্কর্য দুটি রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। বিগত সেনা-সমর্থিত সরকারের শাসনামলে বিমান বন্দরের কাছে সড়কদ্বীপে লালনের ভাস্কর্য অপসারণ করে মৌলবাদীদের দাবি পূরণ করেছিল স্বয়ং সেনা-সমর্থিত সরকার। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সুপ্রিম কোর্টের থেমেসিস ভাস্কর্যটির বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের প্রতিবাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভাস্কর্যটি অপসারণ করেছিল হাসিনা সরকার। শেখ হাসিনা সরকার নিজেদের যেমন অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বলে দাবি করত তা যে কত অসাড় ছিল সেটা আমরা ১৫ বছরের শাসনামলে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। শিক্ষা এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বারংবার হেফাজতে ইসলামের দাবি অনুযায়ী মাধ্যমিকের পাঠ্যসূচিতে ব্যাপক রদবদল ঘটিয়ে অসাম্প্রদায়িক রচনা বাতিল করেছিল। বাতিল করেছিল পাঠ্যসূচি থেকে জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী ডারউইনের রচনা। আমরা জানি হেফাজতে ইসলামসহ মৌলবাদীদের চাষাবাদ হয় মাদ্রাসায়। মাদ্রাসা শিক্ষায় সরকারের কোনোরূপ হস্তক্ষেপ দেখা যায় না। একইভাবে দেখা যায় না ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাক্রমেও। অথচ কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হেফাজতসহ মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং সরকার মাধ্যমিকের সিলেবাস, পাঠ্যসূচিতে ক্রমাগত হস্তক্ষেপ চালিয়ে আমাদের মূলধারার শিক্ষাক্রমকে অনেকটা সর্বনাশের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যার ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান।

বিগত সরকার রাজনৈতিক সমঝোতা করে মাধ্যমিক শিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন করেছিল। সরকার এবং হেফাজত মুখোমুখি অবস্থান থেকে পরস্পর সখ্য হয়ে উঠেছিল। অনুঘটকের কাজটি করেছিল বিগত সরকারের মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। জানা যায়, তিনি হেফাজত প্রধান আল্লামা শফির নিকটাত্মীয়। রেলওয়ের জমি পর্যন্ত হেফাজতের অনুকূলে বরাদ্দ দিয়ে শেখ হাসিনাকে হেফাজতে ইসলাম ‘কওমি জননী’ খেতাবে ভূষিত করেছিল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনমাত্র তারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে শামিল হয়ে ভাস্কর্য ভাঙা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টিতে দ্রুত যুক্ত হয়ে পড়ে। তারা মতিঝিলের শাপলা চত্বরের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদি চত্বর’ নামকরণের তৎপরতা চালালেও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধে শাপলা চত্বরের নাম পরিবর্তন করতে পারেনি। যে চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেটা অনিবার্যরূপে অরাজনৈতিক এবং নিরীহ আন্দোলন ছিল। কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা এই আন্দোলনে যুক্ত ছিল না। আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নামকরণ করা হয়। আন্দোলন চলাকালীন যেসব গান আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল সেগুলো ছিল দেশাত্মবোধক ডিএল রায়ের ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’; মোহিনী চৌধুরী, সলিল চৌধুরী, সুকান্ত, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী গান। ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত গানও। কোনো ইসলামী গান তারা কণ্ঠে তোলেনি। নিয়মিত তাদের কণ্ঠে শোনা গিয়েছে জাতীয় সংগীত। আন্দোলনকারীদের মাথায় বাঁধা ছিল জাতীয় পতাকা। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী কিছু ঘটনা উদ্বেগের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করছি। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো বিষয় এই স্বাধীনচেতা জাতি মেনে নেবে না। আন্দোলনকারীরা সংবিধান সংস্কারের দাবি করেছে সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। সংবিধান পুনর্লিখনের দাবিও তুলেছে। বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে নানামুখী বিতর্ক। মনে হচ্ছে, সরকারের ওপর ভর করে নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সুযোগ হাতাতে তৎপর হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির রাজনৈতিক চক্র। দেশবাসীকে এ বিষয়ে সজাগ ও সচেতন হতে হবে। একটি অরাজনৈতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন যে এরূপ মহিরুহ রূপ লাভ করবে, এটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, বিগত সরকার এবং দেশবাসী ধারণা করতে পারেনি। অহিংস আন্দোলনকারীদের দমনে সরকার তার পূর্ববর্তী কৌশল প্রয়োগ করার ফলেই আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর বিগত আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ঘটনা সবার জানা।

অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে সরকারদলীয় ছাত্র, যুব এবং মূল সংগঠনের লাঠিয়াল ও অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী এবং রাষ্ট্রের সবচেয়ে নিপীড়নকারী পুলিশ বাহিনীকে বেসুমার ব্যবহার করে বিগত ১৬ বছর সফলভাবে বিরোধী দলের আন্দোলনকে দমন করতে পেরেছিল। ওই একই প্রক্রিয়ায় তারা দমনাভিযান পরিচালনা করে। আন্দোলনকে কার্যত সরকারই তুঙ্গে তোলে, নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে। সাধারণ মানুষ এমনিতেই সরকারের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডে ছিল প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। গত ১৬ বছরে এরূপ ভয়ের সংস্কৃতি মুক্ত আন্দোলন আশার সঞ্চার করে এবং দেশবাসী তাতে যুক্ত হয়। সরকার দিশেহারা হয়ে বিজেপি এবং শেষে সেনাবাহিনীকে নামিয়ে চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছিল। সেনাবাহিনী এবং বিজিবি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের মতো সহিংসতার পথাবলম্বন করেনি। প্রায় নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছিল তারা। আন্দোলনে সেনাবাহিনীর অবিতর্কিত অবস্থান গ্রহণে তখন স্লোগান পর্যন্ত মিছিল থেকে দেওয়া হয়েছিল, ‘এই মুহূর্তে দরকার, সেনাবাহিনীর সরকার।’ স্বীকার করতেই হবে, সরকার সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে ক্ষমতা রক্ষার জন্য ব্যবহার করতে চাইলেও নিজ জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী তাতে সম্মত হয়নি। আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটত না, যদি না সেনাবাহিনী সরকারের আজ্ঞাবহতার পরিচয় দিত। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপেই মূলত শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। তাকে প্রায় জোর করে দেশত্যাগে বাধ্য করে। স্বীকার করতেই হবে, বহু ত্যাগ-আত্মত্যাগে সফল গণ-অভ্যুত্থান গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন অতীতে বাস্তবায়িত হয়নি। আগামীতে হবে তেমনটাই আমরা আশা করি। একই সঙ্গে ভুলে যাওয়া যাবে না, ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া মানুষের অধিকার, সমমর্যাদা এবং বৈষম্য দূর হবে না। প্রকৃত কথা হচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সব বৈষম্যের অবসান প্রয়োজন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সফল হয়েছে, প্রত্যাশা থাকলÑ সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্যও কমে আসবে। দেশের সাধারণ মানুষ একটু শান্তি পাক। তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচুক।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

mibabla71@gmail.com