ছেলেকে চিকিৎসা করাতে এসে প্রাণ গেল মা-বাবাসহ ৪ জনের

টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার ভাবন দত্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফারুখ হোসেন সিদ্দিকী। তার দুই ছেলে মোহাইমিন সিদ্দিকী ফুয়াদ (১৪) স্থানীয় ভাবনদত্ত গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ও ফাহিম সিদ্দিকী (১১) স্থানীয় মাদ্রাসার হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। এর মধ্যে বড় ছেলে বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ থাকায় বুধবার রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্ত্রী ও শ্যালিকাসহ ছেলেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে আসছিলেন।

কিন্তু সাভারের পুলিশ টাউন এলাকায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৪ জনই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। বুধবার (৮ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ২টার দিকে সংগঠিত এ সড়ক দুর্ঘটনায় বাসের লকারে থাকা অর্ধশতাধিক ছাগল আগুনে পুড়ে গেছে।

 সড়ক দুর্ঘটনায় সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতরা হলেন- টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার ভাবন দত্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফারুখ হোসেন সিদ্দিকী, তার স্ত্রী মহসিনা সিদ্দিকী, ছেলে মোহাইমিন সিদ্দিকী ফুয়াদ ও শ্যালিকা সিমা আক্তার। এ ঘটনায় আহতরা হলেন- গোলাম রাব্বানী, সবুজ, সাহের আলম, নুরইসলাম, বাবুল হক, শাহিনুর, ও মোরশেদসহ অন্তত ৩০ জন। তাদেরকে উদ্ধার করে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশ জানায়, নিহত ফারুক হোসেন টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার ভাবন দত্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বেশ কিছুদিন ধরে তার ছেলে ফুয়াদ সিদ্দিক অসুস্থ থাকায় গত রাতে ফুয়াদের উন্নত চিকিৎসার জন্য টাঙ্গাইলের গোপালপুর থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা আসছিলেন। পথে সাভার পুলিশ টাউনের সামনে দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়। তবে এ ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সের চালকের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনায় আহত বাসযাত্রী সবুজ জানায়, রাতে আমরা ৭ জন নীলফামারীর জলডাঙ্গা থেকে ঝুমুর পরিবহনের বাসে ঢাকায় আসছিলাম। রাত ২ টার দিকে হঠাৎ আমাদের গাড়িটি সামনের একটি অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের ধাক্কা দিলে গাড়িতে আগুন ধরে যায়। একইসময় পেছন থেকে শ্যামলী পরিবহনের আরও একটি বাস আমাদের বাসের পেছনে মেরে দেয়। এ সময় আমাদের বাসের সামনে গ্লাস ভেঙে গেলে আগুন ভেতরে ঢুকে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে আমরা কোনোমতো জানালা গিয়ে লাফিয়ে নিচে নামি। এ সময় আমার হাত কেটে গেছে এবং কোমরে ব্যথা পেয়েছি। 

অপর যাত্রী নুরইসলাম বলেন, বাসের ভেতরে আগুন লেগে গেলে কোনোমতে জীবন বাঁচাতে গ্লাস ভেঙে বের হই। আমাদের বাসে ৪০ জনের মতো যাত্রী ছিল। যে যেভাবে পারছেন জীবন বাঁচাতে লাফিয়ে পড়েছে। এতে সবারই কমবেশী কেটে ছিড়ে গেছে। 

রফিক নামে এক পথচারী জানান, রাতে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সিলিন্ডার বিষ্ফোরণ থেকে দুইটি চলন্ত বাসে আগুন লাগে। পরে সকালে এসে দেখি পুড়ে যাওয়া বাসের লকারে অনেকগুলো ছাগল পুড়ে মারা গেছে।

সাভার ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ ইনচার্জ মেহেরুল বলেন, মহাসড়কের পুলিশ টাউনের সামনে ঢাকামুখি লেনে একটি অ্যাম্বুলেন্সকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় উত্তরবঙ্গ থেকে ছেড়ে আসা ঝুমুর পরিহনের একটি যাত্রীবাহি বাস। এসময় অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটলে বাসটিতেও আগুন ধরে যায়। একই সময় শ্যামলী পরিহনের আরও একটি বাস পেছন থেকে ঝুমুর পরিবহনের পিছনে সজোরে ধাক্কা দিলে সেই বাসেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর অ্যাম্বুলেন্সের চালকের পাশের আসন থেকে এক পুরুষের মরদেহ এবং অ্যাম্বুলেন্সের পিছন থেকে দুই নারী ও এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়াও ঝুমুর পরিবহনের বাসের লকারে করে ঢাকায় নিয়ে আসা অর্ধ শতাধিক ছাগল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছে।

নিহত ফারুখ হোসেন সিদ্দিকীর ছোটভাই মামুন সিদ্দিকী বলেন, ফারুক সিদ্দিকীর ছেলে ফুয়াদ সিদ্দিকী কিছুদিন ধরে অসুস্থ। ঢাকায় ডাক্তার দেখানোর জন্য বুধবার রাত ১১টার দিকে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হামিদপুর থেকে সবাইকে দোয়া করতে বলে ছেলে ফুয়াদ সিদ্দিকী, স্ত্রী ও তার বোনকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যোগে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দেন। এরপর সকালে তাদের মৃত্যুর খবর জানতে পারি। 

নিহত ফারুখ সিদ্দিকীর সহকর্মী ও চাচাতো বোন সোমা সিদ্দিকীকা বলেন, বাড়ির উঠানে রাখা চারটি খাটিয়া। মরদেহের অপেক্ষা করছেন স্বজনসহ পুরো গ্রামবাসী। কিন্তু স্যারের ছোট ছেলে ফাহিম সিদ্দিকী  হোস্টেলে থেকে মাদ্রাসায় পড়ে। সে এখনো জানে না তার বাবা মা আর ভাই পৃথিবীতে নেই। 

ফায়ার সার্ভিসের ডিএডি (জোন-৪) মো. আলাউদ্দিন বলেন, অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করি। এ সময় দুটি ইউনিটের প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত বাস যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ঢাকাগামী রোগীবাহি অ্যাম্পুলেন্সটি প্রথমে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকে ধাক্কা দেয়। একই সময় পিছনের থাকা ঝুমুর পরিবহনের একটি বাস এবং তার পেছনে থাকা শ্যামলী পরিবহনের আরও একটি অ্যাম্বুলেন্সটিকে ধাক্কা দেয়। এতে অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে থাকা সিএনজি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

সাভার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম জানান, বাস দুটি জব্দ করা হয়েছে। চালক পালিয়ে গেছে। তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পুড়ে যাওয়া দুজন নারী, একজন পুরুষ ও একটি শিশুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। খবর পেয়ে নিহতের পরিবারে সদস্যরাও এসেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।