খাতুনগঞ্জ

রমজানে ভোগ্যপণ্যের সংকটের শঙ্কা

হাতেগোনা কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসছিল দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পণ্য সরবরাহ। কিন্তু ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা গা ঢাকা দিয়েছেন। এখন ছোট ও মাঝারি কিছু ব্যবসায়ী ভোগ্যপণ্য আমদানির মাধ্যমে এ শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছেন। তবে আসছে রমজান মাসে প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য সরবরাহ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

রমজানে খাতুনগঞ্জের বাজারে যেসব অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যের চাহিদা থাকে তার মধ্যে রয়েছে- পেঁয়াজ, মসুর ডাল, খেজুর, ডাবলি, গম, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, চিনি, ছোলা ও পাম অয়েল। 

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সুদূর অতীত থেকেই চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে সারা দেশে সরবরাহ করা হতো ভোগ্যপণ্য। রমজান এলে সারা দেশের ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা ভিড় করতেন খাতুনগঞ্জে। আর খাতুনগঞ্জকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরাই বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্য আমদানি করতেন। বর্তমানে দেশে ভোগ্যপণ্যের দ্বিতীয় বৃহৎ বাজারে ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামালও সরবরাহ করা হয় চট্টগ্রাম থেকে।
 
৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাতুনগঞ্জের অনেক ব্যবসায়ী গা ঢাকা দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম চলে গেছেন সিঙ্গাপুরে। তিনি খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনেরও সভাপতি ছিলেন। খাতুনগঞ্জের ভোগ্য পণ্য সরবরাহের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। অন্যদিকে আলোচিত আরেক শিল্পগ্রæপ এস আলম সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসায়ীও গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে নতুন করে ব্যবসা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে বিগত সরকারের আমলে ক্ষতিগ্রস্ত এমইবি গ্রুপসহ আরও বেশ প্রতিষ্ঠান। 

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরনো ব্যবসায়ীরো গা ঢাকা দেওয়ার কারণে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও ভাটা পড়েছে। আড়ালে থেকে তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। মাহবুবুল আলমের মালিকানাধীন আলম ট্রেডিং সবচেয়ে বেশি ভোজ্য তেল ও পরিশোধিত চিনির ব্যবসা করে আসছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে আগের মতো ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন প্রতিষ্ঠানটির হাতে নেই। মূলত চিনি পরিশোধন করে বাজারে ছাড়ে এস আলম গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, দেশবন্ধু গ্রুপ ও আবুল মোনেম গ্রুপ। অন্যদিকে ভোজ্য তেল আমদানি ও পরিশোধন করে মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ ও টিকে গ্রুপ। 

মিলার কোম্পানিরা প্যাকেট ও মোড়কজাত করে বাজারজাত করার পাশাপাশি ডিও বিক্রির মাধ্যমেও তেল চিনি বিক্রি করেন। আর খাতুনগঞ্জে এসব তেল চিনির ডিও বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপ। 

অন্যদিকে ডাল, চাল, ছোলাসহ অপ্রচলিত পণ্য আমদানি করেন বিএসএম গ্রপ। ডাল আমদানির শীর্ষে আছেন পায়েল ট্রেডার্সের আশুতোষ মহাজন। অন্যদিকে মসলা আমদানিকারকদের মধ্যে মেসার্স এ বি দাশ অ্যান্ড ট্রেডিং কোংয়ের অমর কান্তি দাশ, মেসার্স গুলিস্তান ট্রেডিংয়ের আবদুর রাজ্জাক, মেসার্স আবু মোহাম্মদ অ্যান্ড কোম্পানির আবু মোহাম্মদ অন্যতম। 

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি গ্রুপ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে বাজারে পণ্য সরবরাহে এদের আগের মতো প্রভাব নেই। এই সুযোগে ছোট ও মাঝারি মানের আমদানিকারকরা সীমিত আকারে পণ্য আমদানি করে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা চাহিদা পূরণ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ জাহেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি বড় চালানে পণ্য আমদানি করে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখত। সেই অবস্থার এখন পরিবর্তন হয়েছে। এখন ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসায়ীরাও নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী পণ্য আমদানি করতে পারছে। আগের বড় কোম্পানিগুলোর কোনো বিকল্প ছিল না। এখন পণ্য আমদানিতে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী তৈয়্যবিয়া ট্রেডার্সের কর্ণধার সোলায়মান তালুকদার বলেন, রমজানকে ঘিরে খাতুনগঞ্জে ভোগ্যপণ্যের সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। মূলত পুরনো ব্যবসায়ীরাই এখনো খাতুনগঞ্জে পণ্য সরবরাহ করছেন। তাদের অনেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসতে পারছেন না। যে কারণে রমজানের প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য নির্ধারিত সময়ে আমদানি করা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল বশর চৌধুরি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূলত বাজারই বাজার নির্ধারণ করে। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে যত বেশি অংশগ্রহণ থাকবে, তত বেশি প্রতিযোগিতা থাকবে। এতে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে।

তিনি আরও বলেন, রমজানে ভোগ্য পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর শূন্যতা কতটা পূরণ করতে পারবে, তা সময় হলে বোঝা যাবে।