একজনের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রাণ গেল পরিবারের চারজনের

দুই বছর ধরে থ্যালাসেমিয়ায় ভুগছিল নবম শ্রেণি পড়ুয়া ১৪ বছর বয়সী মোহাইমিন সিদ্দিকী ফুয়াদ। দেহে নতুন রক্ত তৈরি না হওয়ায় রুগ্ণতা বাড়ছিল। কিন্তু ফুয়াদের ছিল বাঁচার আকুতি। স্কুলশিক্ষক বাবা ফারুক হোসেন সিদ্দিকী ও মা মহসিনা সিদ্দিকী ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টাও করে গেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। উন্নত চিকিৎসা করাতে ঢাকায় আনার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে সে। এ নিয়ে অবশ্য ফারুক-মহসিনা দম্পতির শোক বা আপসোস করারও সুযোগ নেই। ওই দুর্ঘটনায় তারা দুজনও নিহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন ফুয়াদের এক খালাও। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটেছে গত বুধবার রাত ২টার দিকে ঢাকার সাভারের ফুলবাড়িয়া এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে। ফুয়াদদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটিতে পেছন থেকে দুটি বাস ধাক্কা দিলে তাতে আগুন ধরে গিয়ে ঘটে ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনা। ওই দুর্ঘটনায় একটি বাসের লকারে থাকা অর্ধশতাধিক ছাগল আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছে।

ওই দুর্ঘটনা ছাড়াও গতকাল ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী ও গোপালগঞ্জে পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে আরও ছয়জন। দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিতশ্ব

আমাদের সাভার, টাঙ্গাইল ও ঘাটাইল প্রতিনিধির তথ্য মতে, সাভারের ওই দুর্ঘটনায় মোহাইমিন সিদ্দিকী ফুয়াদ ছাড়াও নিহত হয়েছেন, ফুয়াদের বাবা ফারুক হোসেন সিদ্দিকী (৫০), মা মহসিনা সিদ্দিকী সোনিয়া (৩৫) এবং খাল মাহফুজা আক্তার সীমা (৩৮)।

ফুয়াদের চাচা হাবিব সিদ্দিকী জানান, মা-বাবার ছেলেকে বাঁচানোর অনেক স্বপ্ন ছিল। অনেক চিকিৎসা করিয়ে ছিলেন। কিন্তু জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা করিয়ে তেমন ভালো ফল না পেয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ফুয়াদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকে যাত্রীবাহী দুটি বাস পেছন থেকে ধাক্কা দিলে অ্যাম্বুলেন্সে আগুন লেগে যায়। আগুনে দগ্ধ হয়ে নিভে যায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া ফুয়াদের প্রাণ। ফুয়াদ স্থানীয় ভবন দত্ত উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং তার বাবা মো. ফারুক হোসেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

ফুয়াদের আরেক ভাই ১০ বছর বয়সী ফাহিম একটি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছে। একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

হাবিব বলেন, আগুনে ফুয়াদসহ তার বাবা-মা ও খালা মারা যান। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সটির চালক বের হতে পারায় প্রাণে বেঁচে যান। তাদের মরদেহ বর্তমানে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো গ্রামের বাড়িতে আনা হবে।

সাভারের ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মকর্তা শিহাব সরকার বলেন, অ্যাম্বুলেন্সকে পেছন থেকে দুটি বাস ধাক্কা দেয়। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সটির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। পরে অ্যাম্বুলেন্স ও যাত্রীবাহী দুটি বাসে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে রাত ২টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

তিনি জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর অ্যাম্বুলেন্সের চালকের পাশের আসন থেকে এক পুরুষের মরদেহ এবং অ্যাম্বুলেন্সের পেছন থেকে দুই নারী ও এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি বাসের লকারে করে ঢাকায় নিয়ে আসা অর্ধশতাধিক ছাগল অগ্নিকা-ে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের ডিএডি (জোন-৪) মো. আলাউদ্দিন বলেন, প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত বাসযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকাগামী রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি প্রথমে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকে ধাক্কা দেয়। একই সময় পেছনের থাকা ঝুমুর পরিবহনের একটি বাস অ্যাম্বুলেন্সটিকে ধাক্কা দেয়। এতে অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে থাকা সিএনজির সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। একই সময়ে ঝুমুর পরিবহনের পেছনে থাকা শ্যামলী পরিবহনের আরও একটি বাসেও আগুন ধরে যায়।

সাভার হাইওয়ে থানার ওসি সওগাতুল আলম জানান, বাস দুটি জব্দ করা হয়েছে। চালক পালিয়ে গেছে। তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

এদিকে আমাদের ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত আরও এক আরোহীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেনশ্ব ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দাপুনিয়া এলাকার লিয়াকত আলীর ছেলে আল-আকসা (৩৫) ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের গোয়ালকান্দি এলাকার মোখলেছুর রহমানের ছেলে শাকিল (২৫)।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ফায়ার সার্ভিসের সামনে বালুবাহী একটি ট্রাক ময়মনসিংহমুখী অবস্থায় দাঁড়ানো ছিল। ভোরে ঘন কুয়াশার ভেতর দ্রুতগতিতে আসা তিন আরোহীসহ মোটরসাইকেলটি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে নিচে চলে যায়। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে দুজনকে মৃত অবস্থায় ট্রাকের নিচ থেকে উদ্ধার করে।

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার মুকসুদপুরে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের উপজেলার রথখোলা নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রায় এক ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও পরে স্বাভাবিক হয়।

রাজৈর থানার ওসি মো. মাসুদ খান জানান, নিহতদের মধ্যে তুহিন শেখ (৩০) রাজৈর উপজেলার ঘোষালকান্দি গ্রামের লিয়াকত শেখের ছেলে ও মুকুল শেখ (২৫) একই গ্রামের নুরু শেখের ছেলে।

উল্লিখিত দুর্ঘটনা ছাড়াও নোয়াখালীতে বাসচাপায় মাঈন উদ্দিন (৫০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আর টাঙ্গাইলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে সাব্বির হোসেন (১৪) নামে এক কিশোরের।