‘আউটসোর্সিং’ সেবার আড়ালে শোষণ

সেবা পেতে কে না চায়? মানুষের জীবন সহজ হয়ে ওঠে অন্যের সেবা পেয়ে। এটা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সত্য। ব্যক্তির জীবনমান এবং প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশ উন্নত করার কথা সবাই ভাবে আর সবাই চায় সেবার মান উন্নত হোক। কিন্তু যার কাছ থেকে বা যাদের কাছ থেকে সেবা নেওয়া হয় তাদের কথা কি কেউ ভাববে না? যদি মর্যাদা এবং মূল্য দেওয়া না হয়, তাহলে সেবার অপর পিঠেই থাকে শোষণ। তখন যার কাছ থেকে সেবা নেওয়া হয় তাকেই শোষণ করা হয়। ফলে সেবা পেয়ে তৃপ্তির বিপরীতে সেবা প্রদানকারীর মধ্যে তৈরি হয় বঞ্চনার বোধ, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি বিক্ষোভ এবং কাজের পরিবেশ ও মানের অবনতি। এ রকম এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে। আউটসোর্সিং নামে এক পদ্ধতির আড়ালে চলছে শ্রম শোষণ আর বঞ্চনা। আইনের নামে মানবিক অধিকার হরণের এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া।  

কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাই সেই প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। তাদের শ্রমেই প্রতিষ্ঠানের উন্নতি বা অগ্রযাত্রা সূচিত হয়। তার জীবন-মরণ নির্ভর করে যে প্রতিষ্ঠানের সেবার ওপর, সেটি হাসপাতাল বা দেশের সব কাজের পরিকল্পনার কেন্দ্র সচিবালয় যাই হোক না কেন, সব ক্ষেত্রেই সত্য। কিন্তু গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহের মতো জরুরি সেবা খাত, টেলি কমিউনিকেশন, নির্বাচন কমিশনসহ ৬৬টি মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী পদগুলোতে স্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করা হচ্ছে না। বছরের পর বছর কাজ করবে, কিন্তু বেতন বাড়বে না, দক্ষতা অর্জন করবে কিন্তু স্বীকৃতি পাবে না, প্রতি বছর আতঙ্কে থাকবে এই বুঝি চাকরিটা চলে যায়, প্রতিষ্ঠান স্থায়ী, কাজটাও প্রয়োজনীয় কিন্তু চাকরিটা স্থায়ী নয় এ রকম কাজে নিয়োজিত প্রায় ৬ লাখ কর্মচারী আছে বাংলাদেশে। 

আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবাগ্রহণ নীতিমালা ২০১৮ অনুযায়ী সেবা ক্রয়ের জন্য নির্ধারিত সেবাগুলোর যে তালিকা করা হয়েছে তাতে রয়েছে ১২ ধরনের খাত। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আউটসোর্সিং বলে পরিচিত এ ধরনের শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করা হচ্ছে সিকিউরিটি গার্ড বা নিরাপত্তা প্রহরী, ক্লিনার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সহকারী গার্ডেনার, ইলেকট্রিক্যাল হেলপার, কার্পেন্টার বা কাঠমিস্ত্রি, হেলপার, স্যানিটারি হেলপার, পাম্প হেলপার, গাড়ির হেলপার, এসি মেকানিক হেলপার, চৌকিদার, ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট, ইমারজেন্সি অ্যাটেনডেন্ট, স্ট্রেচার বেয়ারার, ওয়ার্ড বয়, আয়া, সহকারী বাবুর্চি, লিফটম্যান, লাইনম্যান, ফরাশ লস্কর, মাসন হেলপার, ম্যাসেঞ্জার, মশালচি, অ্যানিমেল অ্যাটেনডেন্ট, গেস্ট হাউস অ্যাটেনডেন্ট, হোস্টেল অ্যাটেনডেন্ট, ডোম, বাইন্ডার, অদক্ষ শ্রমিক ড্রাইভার (হেবী), সুপারভাইজার, কেয়ারটেকার, ওয়ার্ড মাস্টার, ইলেকট্রিশিয়ান, লিফট মেকানিক, এসি মেকানিক, পাম্প মেকানিক, জেনারেটর মেকানিক, অন্যান্য কারিগরি কাজসংক্রান্ত টেকনিশিয়ান এবং সহকারী ইঞ্জিন মেকানিক, টেন্ডল, গ্রিজার, টেইলর, ডুবুরি, লন্ড্রি অপারেটর, ফরাশ জমাদার, সহকারী ইলেকট্রিশিয়ান, শুকানি, বাবুর্চি কুক, গার্ডেনার বা বাগানকর্মী দক্ষ শ্রমিক হিসেবে।

মানুষ বেঁচে থাকে আশায়। কিন্তু আউটসোর্সিং কর্মীদের জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে আশা। সেখানে ভর করেছে অনিশ্চয়তা। কিন্তু অনিশ্চয়তার এই কাজে নিশ্চিত মুনাফা বা সত্যি কথা বললে নিশ্চিত লুটপাটের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে এক দল ঠিকাদারকে। ঠিকাদাররা পণ্য সরবরাহ করে, নানা ধরনের কাজ করে দেয় তাদের প্রতিষ্ঠান দ্বারা, এটা জানা সবার। অতীতের অপমানের কথা ভুলে যেতে চায় সবাই। যে কারণে ইউরোপ-আমেরিকা ভুলে যেতে চায় কীভাবে তারা দাস সরবরাহ করত। দাস প্রথা এখন ইতিহাসের বিষয়, কিন্তু আধুনিক রূপে যে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, এটা খেয়াল করছে না অনেকেই। আউটসোর্সিং ঠিকাদাররা অনেকটা আধুনিক দাস সরবরাহকারী আর শ্রমিকদের জীবনকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে দাসের কাতারে। যারা কোনোমতে জীবনধারণ করবে। যাদের জীবনে ভবিষ্যতের কোনো আশা থাকবে না। সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যাবে, টেকনিশিয়ান পাওয়া যাবে এবং তাদের কোনো দায়িত্ব নিতে হবে না, যখন তখন ছাঁটাই করে দেওয়া যাবে, এটা খুব লোভনীয় ব্যাপার। এই লোভ এবং লাভের ব্যবসা যে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে কত যুবকের জীবন, কত কর্মক্ষম মানুষ যে অতিরিক্ত পরিশ্রম আর দুশ্চিন্তার ভারে অকালে বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, কত মানুষ স্বপ্ন দেখতেও ভয় পাচ্ছে তার খবর রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা রাখেন না। আউটসোর্সিং কর্মচারী হলে তার ওভারটাইম, বোনাস, উৎসব ভাতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধাসহ  শ্রম আইনে স্বীকৃত কোনো অধিকার নেই। কোনো নারী কর্মী সন্তানসম্ভবা হলে তার চাকরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়, তার অনুপস্থিতির সময় অন্য কাউকে নিয়োগ করা হয়, ফলে সে আর চাকরি ফিরে পায় না। এক অমানবিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হয় তাকে, সন্তান না চাকরি কোনটা বেছে নেবে সে? সরকারি প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিং কর্মচারী, চাকরির নেই নিশ্চয়তা তাই তারা বিয়ে করা বা সংসার  করতেও ভয় পায়। সরকারি সংস্থা বলতে পারে, তারা তো নিয়ম অনুযায়ী বেতনভাতার টাকা পরিশোধ করছেন, তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। এখন নিয়মটা কি আছে দেখা যাক! আউটসোর্সিং কর্মীদের মাসিক সেবামূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫টি ক্যাটাগরিতে এবং অঞ্চল ভাগ করা হয়েছে ৩টি। ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা ব্যতীত বাকি বিভাগীয় শহর এবং সিটি করপোরেশন আর দেশের বাকি জেলাগুলো। ঢাকায় ক্যাটাগরি-১-এর মজুরি ১৯ হাজার ১১০ টাকা, ক্যাটাগরি-২-এর মজুরি ১৮,৬১০ টাকা, ক্যাটাগরি-৩-এর মজুরি ১৮,২১০ টাকা, ক্যাটাগরি-৪-এর মজুরি ১৭,৯১০ টাকা এবং ক্যাটাগরি-৫-এর মজুরি ১৭,৬১০ টাকা। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এলাকায় ক্যাটাগরি-১-এর মজুরি ১৮,১২০ টাকা আর ক্যাটাগরি-৫-এর মজুরি ১৬,৬২০ টাকা। অন্যান্য জেলা শহরে ক্যাটাগরি-১-এর মজুরি ১৭,৬৩০ টাকা এবং ক্যাটাগরি-৫-এর মজুরি ১৬,১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকরা এই টাকা কি পেয়ে থাকেন, ঠিকাদার বা মধ্যস্বত্বভোগী সংস্থা কত নেয় তার কি কোনো খোঁজ তারা নেবেন না?

শ্রমিকের বঞ্চনা বা ঠকানোর একটা সম্ভাব্য হিসাব করে দেখা যাক! কোনো প্রতিষ্ঠান ৬০ জন গার্ড সরবরাহ করার জন্য কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করল। ১৯,১১০ হিসেবে চুক্তি করে এক বছরের জন্য টাকা দিতে হবে। টাকার পরিমাণ তাহলে বছরে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৭ লাখ ৫৯ হাজার ২০০ টাকা। ৮ ঘণ্টার ডিউটির পরিবর্তে ১২ ঘণ্টা করে ডিউটি করানোর জন্য শ্রমিকের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলে ঠিকাদাররা। ফলে তিনজনের কাজ ২ জনকে দিয়ে করালে ২০ জন গার্ড কম লাগবে। এই ২০ জনের মজুরি বাবদ ৪৫ লাখ ৮৬ হাজার ৪০০ টাকা প্রথমেই লাভ। এরপর প্রতি শ্রমিককে বেতন দেওয়া হয় ১৪ হাজার টাকা করে। প্রতি শ্রমিক বাবদ ৫ হাজার টাকা কম দেওয়ার ফলে ৪০ জন শ্রমিক থেকে বছরে ২৪ লাখ টাকা লাভ। তাহলে কী দাঁড়ায়? ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বিল থেকে কোম্পানি নিয়ে যায় ৬৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা আর শ্রমিকরা পায় ৬৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এটা একটা সাধারণ হিসাব, বাস্তবের সঙ্গে যে কেউ মিলিয়ে দেখতে পারেন।

আউটসোর্সিং ব্যবসা ঠিকাদার এবং সরকারি কর্তাব্যক্তিদের জন্য যে কত লাভজনক তা বুঝতে পারা যায় সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতেও ১৪টি ঠিকাদারি কোম্পানির মাধ্যমে শ্রমিক সরবরাহ করার চিত্র দেখে। এ ছাড়া সারা দেশে ৬ লাখ শ্রমিকের কাছ থেকে কমিশনের নামে গড়ে ৫ হাজার টাকা করে নিলে কোম্পানিগুলোর কমিশন বাবদ আয় দাঁড়ায় বার্ষিক ৩৬০০ কোটি টাকা। এর বাইরে নিয়োগ দেওয়ার নামে কমপক্ষে ১ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়ার কথা প্রায় প্রকাশ্য। প্রতি বছর নবায়নের নামে এই টাকা নেওয়া হয়। টাকা না দিলে চাকরি নেই এই ভয়ে শ্রমিকরাও টাকা দিতে বাধ্য হয়। ফলে এভাবেও প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়। ফলে বেকার ও অসহায় যুবকদের কাছ থেকে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা শোষণের নীরব বাণিজ্য চলছে। বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী ৭ ধরনের শ্রমিক আছে। শিক্ষাধীন, বদলি, সাময়িক, অস্থায়ী, শিক্ষানবিস, স্থায়ী ও মৌসুমি শ্রমিক। এখানে আউটসোর্সিং একটি নতুন বিষয়। ২০১৩ সালে সংশোধিত শ্রম আইনে বলা হয়েছে, এই আইন প্রবর্তন হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে ঠিকাদার সংস্থাকে নিবন্ধন করতে হবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে নিবন্ধনহীন ঠিকাদার কোম্পানি শ্রমিক সরবরাহ করে যাচ্ছে, যা দেখলেও কিছু করার সাহস কারও নেই। গত ১৫ বছর ক্ষমতাসীন দলের মদদপুষ্ট কর্মকর্তা ও কোম্পানি মিলে এই শোষণের রাজত্ব চালিয়েছে। আজ সেই শাসক নেই, কিন্তু শোষণের এই পদ্ধতি কি এখনও এভাবে চলতে পারে? অন্যদিকে সরকার শ্রমিকদের মেধা অনুযায়ী টাকা ঠিকই দিচ্ছে কিন্তু আউটসোর্সিং কোম্পানির নামে একদল মধ্যস্বত্বভোগী শ্রমিকদের বঞ্চিত করে দীর্ঘদিন ধরে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে এ ধরনের প্রতারণার হাত থেকে শ্রমিকদের মুক্ত করার দায়িত্ব সরকারের।

৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর বৈষম্য থেকে মুক্তির আশায় আউটসোর্সিং কর্মচারীরা রাজপথে নেমেছিল তাদের বৈষম্য ও বেদনার কথা বলতে। হাজার হাজার কর্মচারী জমায়েত করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে গিয়ে তাদের বঞ্চনা দূর করার আবেদন জানিয়ে এসেছে। তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন করা, স্থায়ী পদে নিয়োগ দেওয়া, কোম্পানির কমিশনের নামে লুণ্ঠন বন্ধ করার দাবিতে আন্দোলনে আছে তারা। এ কথা ঠিক, কাজের অনিশ্চয়তা থাকলে আনুগত্য হয়তো বাড়ে কিন্তু দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ে না। অসন্তুষ্ট কর্মচারীর কাছ থেকে ভালো সেবা কীভাবে আশা করা যায়? পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার কথা ভাবলেও আউটসোর্সিং একটি বিপজ্জনক বিষয়। শুধু সস্তায় শ্রমিক পাওয়ার জন্য এই অমানবিক পদ্ধতি দেশে ভবিষ্যতে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

rratan.spb@gmail.com