আবার মূল্য খড়গ!

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে একটি কালচার শুরু হয়েছে। নতুন বছরে এসেই আমরা ভাবতে থাকি, এবার কোন কোন পণ্যের মূল্য বাড়বে। ঠিকই বাড়ে, তবে তা যতটুকু সাধারণ মানুষের জন্য, ঠিক ততটুকু উচ্চবিত্তের জন্য নয়। আবার সামগ্রিক অর্থে দেখা যাবে, যেসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে সামষ্টিক অর্থে দেশের অগ্রগতিতে সেটি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে।

কিন্তু চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝপথে এসে শতাধিক পণ্য ও সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ আরেক দফা বাড়বে। চলতি বছরের শুরুতেই জানা গিয়েছিল, বাংলাদেশকে ঋণ দিতে আইএমএফ কর-জিডিপি অনুপাত ০.২ শতাংশ বাড়ানোর শর্ত দিয়েছে। টাকার অঙ্কে যা ১২ হাজার কোটির বেশি। এই অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে যোগ হবে। রাজস্ব ঘাটতি মেটাতেই যে এই পদক্ষেপ, তা সবাই বোঝেন। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ওষুধ শিল্প, মোবাইল ফোন অপারেটর, ইন্টারনেট, হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের কথা, এই ভ্যাটের ফলে তাদের শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা গ্রাহক হারাবেন। ভ্যাটের বাইরেও তাদের ট্যাক্স দিতে হয়। ফলে এখন পণ্য ও সেবামূল্য বেড়ে যাবে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির জেরে এমনিতেই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। আরও দাম বাড়লে তারা কেনা কমিয়ে দেবেন। ফলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয় পক্ষই পড়বে ক্ষতির মুখে। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মোবাইল ফোনে কথা বলা, হোটেল-রেস্তোরাঁ সেবা, ইন্টারনেট সেবা, কোমল পানীয়, সিগারেটসহ শতাধিক পণ্য ও সেবায় শুল্ক ও কর বাড়িয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার রাতে এ সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ না থাকায় অধ্যাদেশের মাধ্যমে শুল্ক-কর বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অধ্যাদেশের পরিবর্তনগুলো সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়ে গেছে। এ ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় আরও যুক্ত হবে মিষ্টি, ওষুধ, এলপি গ্যাস, ফলের রস, ড্রিংক, বিস্কুট, চশমার ফ্রেমসহ নানা পণ্য।

পণ্য ও সেবার তালিকা বিশ্লেষণ করে চাল, ডাল, আটা, তেলের মতো পণ্য না থাকলেও যেসব পণ্য ও সেবার শুল্ক-কর বাড়ানো হয়েছে এগুলোর বেশিরভাগ বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় হওয়ায় তা খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে। বছরের শুরুতেই জানা গিয়েছিল, বাংলাদেশকে ঋণ দিতে আইএমএফ কর-জিডিপি অনুপাত ০.২ শতাংশ বাড়ানোর শর্ত দিয়েছে।  টাকার অঙ্কে যা ১২ হাজার কোটির বেশি। এই অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে যোগ হবে। রাজস্ব ঘাটতি মেটাতেই যে এই পদক্ষেপ, তা সবাই বোঝেন।

এর ফলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয় পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়বে। ইনকাম ট্যাক্সও এ সময়ে বাড়ানো যাবে বলে মনে হয় না। তাহলে একমাত্র উপায় হচ্ছে, বিনিয়োগ বাড়ানো। এর জন্য ব্যাংক সুদ হার আর এনবিআরে দুর্নীতি কমাতে হবে। 

মনে রাখতে হবে, দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পণ্যমূল্যের চাপে রেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। কিন্তু তাদের আয় সেই হারে বাড়ছে না। বিগত সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল পণ্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। একদিকে সরকারের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে নির্দিষ্ট শ্রেণির দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে চিড়েচ্যাপ্টা করা। এবার মানুষ ভাবতে চায়, তাদের এবং খুচরা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমস্যা আন্তরিকভাবে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা মানবিকতার সঙ্গে বিবেচনা করবেন। সামষ্টিকের জন্য বের করে আনবেন সন্তোষজনক সমাধানের পথ।