নিলামে বিক্রীত পণ্য

কাস্টমসের কাছে ১৪২ কোটি টাকা পায় বন্দর কর্তৃপক্ষ

প্রতি মাসেই চট্টগ্রাম কাস্টমস পণ্যের নিলাম হয়। সেই নিলাম বাবদ অর্থও সরকারি কোষাগারে জমা হয়। কিন্তু সেই অর্থের একটি অংশ পায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বছরের পর বছর বন্দরের জায়গায় পড়ে থাকা এসব পণ্যের বিক্রীত মূল্য থেকে একটি অংশ পায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেই পাওনা চেয়ে এ পর্যন্ত ৫৯টি পত্র দিলেও কাস্টমস থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

গত ডিসেম্বরে কাস্টমস কমিশনার বরাবর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী নিলামে বিক্রীত পণ্যের বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হিস্যা বাবদ ১৪২ কোটি ৭২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪০ টাকা চট্টগ্রাম কাস্টমসের কাছে পায়। এসব টাকা পরিশোধের জন্য ২০১১ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৫৮টি চিঠি দেওয়া হয়েছে। নিলামে যেসব পণ্য বিক্রি হয়, তাদের মধ্যে এফসিএল (পণ্যভর্তি কনটেইনার) কনটেইনার থেকে নিলামে বিক্রয়লব্ধ অর্থের ২০ শতাংশ এবং এলসিএল (খোলা পণ্যের কনটেইনার) কনটেইনার পণ্যের বিক্রয়লব্ধ অর্থের ১৫ শতাংশ অর্থ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাপ্য।

বছরের পর বছর এসব টাকা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের রিফান্ড শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নিলামে বিক্রয়লব্ধ অর্থ চালানের মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে জমা হয়। সেখান থেকে পরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হিস্যা বের করে আনা সময়সাপেক্ষ। তাই বন্দরের পক্ষ থেকে দফায় দফায় চিঠি দিলেও কিছু করার নেই। বন্দর স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান আর আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত সরকারের মতামত ছাড়া নেওয়া যায় না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সচিব ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী বন্দরের প্রাপ্য চট্টগ্রাম কাস্টমসের কাছে চাওয়া হয়েছে। এখন তারা এই অর্থ পণ্য নিলামে বিক্রির সময় দুটি পে-অর্ডারের (একটি কাস্টমস ও অন্যটি বন্দর কর্তৃপক্ষ) মাধ্যমে পরিশোধ করলে টাকাগুলো বকেয়া থাকত না।’

প্রায় প্রতি মাসে নিলামে বিক্রীত পণ্য কেনেন বিডাররা (যারা নিলাম ডাকের মাধ্যমে পণ্য কেনেন)। এ বিষয়ে বিডার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ইয়াকুব চৌধুরী বলেন, ‘আমরা নিলামে যে টাকা দিয়ে পণ্য কিনি, সেই টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে কাস্টমসকে পরিশোধ করি। একই সঙ্গে এই টাকার ভ্যাট ও ট্যাক্স পৃথক চালানে পরিশোধ করি। আমাদের যেভাবে টাকা পরিশোধ করতে বলবে, আমরা সেভাবেই পরিশোধ করব।’

কিন্তু বন্দরের হিস্যা বন্দরকে দেওয়া হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার সাকিব হাসান বলেন, ‘আগেকার টাকা হয়তো কিছু বকেয়া থাকতে পারে। সেই টাকা পরিশোধের জন্য বন্দরের পক্ষ থেকে হয়তো চিঠি আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা তাদের (বন্দর কর্তৃপক্ষ) টাকা পরিশোধ করছি।’

কীভাবে এই টাকা পরিশোধ করছেন? এই প্রশ্নের জবাবে সাকিব হাসান বলেন, ‘নিলামের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ একটি হিসাব নম্বরে জমা হয়। সেই হিসাব নম্বর থেকে সবার আগে নিলাম শাখা, শুল্কায়ন, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারসহ কিছু সংস্থার হিস্যা রয়েছে। তাদের টাকা পরিশোধের পর টাকা থাকলে অতিরিক্ত টাকার একটি শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পায়। বন্দর কর্তৃপক্ষ পাওয়ার পরও যদি টাকা থাকে, তাহলে আমদানিকারকও টাকা পেয়ে থাকে।’

চট্টগ্রাম বন্দরে যেসব পণ্য আসে, সেগুলো ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক ডেলিভারি না নিলে নিলামের জন্য কাস্টমসকে চিঠি দেয়। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে নিলাম প্রক্রিয়া গ্রহণ করে। তবে অনেক সময় মামলা ও নিলাম প্রক্রিয়া যথাযথ সময়ে করতে না পারলে পণ্যগুলো ধ্বংস করা হয়। তবে অপচনশীল বেশিরভাগ পণ্য নিলামে বিক্রি হয়। পচনশীল পণ্যগুলোর মধ্যেও যেগুলোর গুণগত মান ভালো থাকে, যেমন খেজুর, কমলা, আঙুর, আপেল ও মালটা এগুলো প্রায়ই নিলামে বিক্রি হয়ে থাকে।

অন্যদিকে গাড়ি ও বিভিন্ন লৌহজাতসামগ্রী নিলামে বিক্রি হয়। আবার যেগুলো বিক্রি করা যায় না, সেগুলো ধ্বংস করা হয়। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ রুটিনকাজের অংশ হিসেবে এসব পণ্য নিলাম ও ধ্বংস প্রক্রিয়া গ্রহণ করে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে এখনো ১০ হাজারের বেশি পণ্যবোঝাই কনটেইনার নিলামের অপেক্ষায় রয়েছে।