বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত হওয়া নারীসহ ৭ জনের মরদেহ এখনো পড়ে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মরচুয়ারিতে। গতকাল রবিবার পৃথক দুটি পরিবার দুটি মরদেহ প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করে। তবে ডিএনএ নমুনা মেলার পর লাশ হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে মর্গ কর্তৃপক্ষ।
সেলিনা বেগম নামে এক নারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে গিয়ে সেখানে লাশগুলো দেখে একটি তার স্বামীর মরদেহ বলে দাবি করেন। তার স্বামীর নাম কাবিল হোসেন (৫৭)। তিনি মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন। এছাড়া নুরে আলম নামে আরেক যুবক তার ভাতিজার মরদেহ শনাক্ত করেন। তার নাম হাসান (২০)।
গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে স্বজনরা যাত্রাবাড়ী থেকে নিখোঁজ হাসানের মরদেহ দেখে তার ভাতিজার মরদেহ বলে দাবি করেন চাচা নুরে আলম। শনিবার সন্ধ্যার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে সেলিনা বেগম তার স্বামীর মরদেহ শনাক্তের দাবি করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের ইনচার্জ রামু দাস বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত এক নারীসহ ৭ জনের মরদেহ মরচুয়ারিতে রাখা আছে। সবগুলো মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। কোনো স্বজন না থাকায় সবগুলো মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে অনেক স্বজন মরদেহ শনাক্তের জন্য এলেও কেউ পুরোপুরি শনাক্ত করতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, দুপুরে একটি মরদেহ শনাক্তের দাবি করেন এক স্বজন এবং শনিবার সন্ধ্যার দিকে মর্গে এসে এক নারী তার স্বামীর মরদেহ বলে দাবি করেন। তাদের থানায় ও সিআইডিতে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিহত হাসানের চাচা নুরে আলম বলেন, তাদের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার কাছিয়া সাহামাদার গ্রামে। হাসান যাত্রাবাড়ী সুতিখালপাড় বালুর মাঠ এলাকায় থাকতেন। গুলিস্তানে এরশাদ মার্কেটে একটি ইলেক্ট্রিকের দোকানে কাজ করতেন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে হাসান ছিলেন বড়। তিনি আরও জানান, গত ৫ আগস্ট বিকেলে আনন্দ মিছিলের জন্য সুতিখালপাড়ের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন হাসান। এরপর আর বাসায় ফেরেননি। অনেক হাসপাতাল খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে যাত্রাবাড়ী এলাকার রাস্তায় এক যুবকের পায়ে তার পেঁচানো, সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা একটি লাশের ছবি ভাইরাল হয়। সেটিই হাসানের মরদেহ ছিল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে কয়েকবার এসে ৬টি মরদেহ দেখে গেছি। তবে শনাক্ত করতে পারিনি। দুদিন আগে ফেসবুকে কয়েকটা ছবি দেখে আবার ঢাকা মেডিকেলে আসি। একটি মরদেহ আমার ভাতিজা হাসানের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। তবে এর আগে কয়েকবার এসেছি, এই মরদেহটি দেখতে পাইনি।
সেলিনা বেগম বলেন, তাদের বাসা মুগদা মানিকনগর এলাকায়। গত ৫ আগস্ট সকালে মানিকনগর বাসা থেকে তার স্বামী কাবিল হোসেন বের হন। সেই দিনের পর থেকে স্বামী কাবিল হোসেন আর বাসায় ফিরে আসেননি। অনেক জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর কোথাও পাইনি। ফেসবুকের মাধ্যমে দেখতে পাই ৭টি মরদেহ এখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রয়েছে। এরপর শনিবার সন্ধ্যার দিকে সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে গিয়ে ফ্রিজে থাকা স্বামী কাবিল হোসেনের মতোই একটি মরদেহ দেখতে পাই। আমরা ডিএনএ নমুনা দেব।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ক বিশেষ সেলের প্রধান সদস্য নাফিসা ইসলাম সাকাফি বলেন, আন্দোলনে নিহত দুই পরিবার দুটি মরদেহ শনাক্তের দাবি তুলেছেন। যেহেতু মরদেহগুলো সরাসরি চেনার কোনো উপায় নেই। তাই স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। আমরা সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করছি।
এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মুনসুর বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নিহত কয়েকজনের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে আছে। এর মধ্যে ৬টির মরদেহের সুরতহাল শাহবাগ থানা পুলিশ করেছে। একটি মরদেহের সুরতহাল করেছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। সেলিনা বেগম নামে এক নারী একটি মরদেহ তার স্বামীর বলে দাবি করেন। তবে তার স্বামীর বয়স ও মরদেহটির বয়সের অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবে ডিএনএ নমুনা দিতে আবেদন করলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যাত্রাবাড়ীর অপর একটি মরদেহ শনাক্তের দাবি করেছে স্বজনরা। তাদের যাত্রাবাড়ী থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের মর্গে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শহীদ সাতজনের মরদেহের সন্ধান পাওয়া গেছে। লাশগুলোর মধ্যে একজনের নাম এনামুল (২৫), বাকিরা অজ্ঞাত। লাশগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের পরিহিত আলামতও সংগ্রহ করা হয়েছে।