শাসক ও অশাসক এলিট

ইংরেজি এরিস্টোক্রেসি শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘এরিস্টোক্রেটিয়া’ থেকে এসেছে। অর্থ ‘সেরা শাসন’। এরিস্টো মানে শ্রেষ্ঠ বা অভিজাত, আর ক্রেটিয়া মানে শাসন। যদিও মধ্যযুগের এরিস্টোক্রেসি আর পরবর্তী সময়ের অভিজাতন্ত্রের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে বলে কেউ কেউ দেখান, গড়পড়তা ধারণাটি অভিন্ন। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করে অবশেষে ক্ষমতাবান হয়ে নতুন রঙের অভিজাত শাসক বংশ বা কর্র্তৃত্ববাদীব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নজির তো দেশে দেশে রয়েছেই। যদিও সেসব ক্ষমতাবানরা জিরো থেকে হিরো হয়ে ফের জিরো হওয়ার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। তো এই যে এরিস্টোক্রেসি বা অভিজাততন্ত্র, এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিকব্যবস্থা, যেখানে শাসন বা নেতৃত্বের ক্ষমতা সীমিত সংখ্যক ব্যক্তিদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকবে, যারা সাধারণত সমাজের ধনী, শিক্ষিত বা প্রভাবশালী অংশ। যদিও অভিজাতদের দেওয়া ব্যবস্থা কখনো কখনো কার্যকর ও সুশৃঙ্খল মনে হতে পারে, তবে এর নেতিবাচক দিকও প্রবল।

প্রাকৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামাজিক পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সমাজ, ভাষা, সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। একটি তত্ত্বের কথা এখানে বলা যায়। সেটি হলো চক্রাকার তত্ত্ব। এ তত্ত্বের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, সমাজ চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। চক্রাকার তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা প্যারেটো বলেন, ‘সমাজ পরিবর্তনের ধারা চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে এবং সমাজ ঘুরে-ফিরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।’ তিনি তার তত্ত্বে এলিট চক্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন সমাজ কীভাবে আবর্তিত হয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী শাসক এলিটরা চিরকাল ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। পারে না সম্ভব নয় বলেই। এক সময় তাদের ক্ষমতা ফুরিয়ে যায়, ফলে তাদের পরিবর্তে অশাসক এলিটরা ক্ষমতা দখল করে। এভাবে শাসক ও অশাসক এলিটের মধ্যে চক্রাকারে ক্ষমতার হস্তান্তর চলতে থাকে। তিনি এই চক্রাকারে আবর্তনকেই সমাজ পরিবর্তনের সূত্র চিহ্নিত করেছেন। প্লেটো মনে করতেন, শাসনব্যবস্থার একটি প্রাকৃতিক ধারা রয়েছে। এক ধরনের অভিজাততন্ত্র (গুটিকয়েকের দ্বারা আদর্শ শাসনব্যবস্থা), যা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে একটি টিমোক্রাসিতে (সম্পদশালীদের শাসন) পরিণত হয় এবং এর স্থলাভিষিক্ত হয় এমন ব্যক্তিদের দ্বারা শাসন যারা প্রধানত সম্মান ও সামরিক গুণাবলির প্রতি মনোযোগী। পরে এটি অলিগার্কিতে (গুটিকয়েকের দ্বারা শাসনের নিম্নমানের রূপ) রূপান্তরিত হয়, যা পরে গণতন্ত্রে (অনেকের দ্বারা শাসন) পরিণত হয়। অতিরিক্ত মতের গুরুত্ব দিতে গিয়ে গণতন্ত্র একটি বিশৃঙ্খলায় (আইনহীন শাসন) রূপ নেয়। তখন এর স্থলাভিষিক্ত হয় অবশ্যম্ভাবী একনায়ক। প্লেটোনিক টাইপোলজিতে ক্ষমতার অপব্যবহার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে শাসকদের প্রচলিত আইন বা রীতিনীতির প্রতি অবহেলা করার কারণে। এ ক্ষেত্রে প্লেটোর উপসংহার আদর্শ শাসনব্যবস্থা আইন মান্যকারীদের দ্বারা হয়ে থাকে।

অভিজাততন্ত্রের ইতিহাসে একটু নজর দেওয়া যাক। প্রাচীন গ্রিসে অভিজাততন্ত্র প্রথম ব্যাপকভাবে দেখা যায়। গ্রিসের নগর-রাষ্ট্রগুলো (পলিস) শুরুর দিকে অভিজাত শাসকদের দ্বারা পরিচালিত হতো। এথেন্সের প্রাচীন শাসনব্যবস্থা এক সময় অভিজাতদের হাতে ছিল, যা পরে গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। প্রাচীন রোমের প্রজাতন্ত্রকালে অভিজাততন্ত্র ছিল মূল শাসনব্যবস্থা। সেনেট এবং প্যাট্রিসিয়ান (অভিজাত) শ্রেণির মাধ্যমে আইন ও নীতি নির্ধারিত হতো। মধ্যযুগে ইউরোপে অভিজাততন্ত্র আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় জমিদার, ব্যারন, এবং রাজপরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ম্যাগনাকার্টা চুক্তি (১২১৫) রাজাদের ক্ষমতা সীমিত করে অভিজাত শ্রেণির প্রভাব বাড়িয়েছিল। চীনের রাজবংশগুলোতেও (যেমন তাং ও সং রাজবংশ) ধনী ও শিক্ষিত পরিবারগুলো প্রশাসনিক ও সামাজিক উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিল। ১৭-১৮ শতকে ইউরোপে অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) অভিজাততন্ত্রকে উৎখাত করে গণতন্ত্র ও সাম্যবাদী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ইউরোপীয় উপনিবেশে অভিজাত শ্রেণি উপনিবেশের সম্পদ ও ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করেছিল।

বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণি বর্তমানে একটি দ্রুত আধুনিকায়ন এবং গণতান্ত্রিক সমাজে ক্রমশ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। এই পরিবর্তন কেবল একটি যুগের অবসান নয়, বরং ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে। বাংলাদেশের এই নতুন অধ্যায়ে প্রতিটি কণ্ঠের অবদান মূল্যবান। ইতিহাস দেখায়, বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণির উত্থান মুঘল আমলে হয়েছিল। তখন বিশ্বস্ত অনুগতদের বড় জমি ও উপাধি প্রদান করা হতো। এই জমিদার ও নবাবরা প্রভাবশালী শ্রেণি হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ শাসনকাল ও ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার সময় পর্যন্ত তাদের প্রভাব ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের সূচনা করে। কিন্তু একাত্তরের পর নতুন রূপের অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস দেখা দিয়েছিল তাও বিবেচনায় নিতে হয়। অভিজাততন্ত্রে সামগ্রিকভাবে কী থাকে? থাকে বৈষম্য, মানে থাকে সমতার অভাব, মানে সমঅধিকারের অভাব। কেননা এ ব্যবস্থায় সাধারণত ক্ষমতা এবং সম্পদ বিশেষ একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈষম্য এবং অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সেই ব্যবস্থায় জনগণের ইচ্ছার চেয়ে অভিজাতদের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পায়, যা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী। ক্ষমতা কেবলমাত্র কিছু মানুষের হাতে থাকলে তা অপব্যবহারের সম্ভাবনা থাকে। ফলে দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতি বাড়ে। বাংলাদেশের মানুষ এর দীর্ঘ স্পষ্ট অভিজ্ঞতা পেয়েছে। তারা পারসোনালিটি কাল্টের জাদুকরী বয়ান মানুষের সামনে নিয়ে আসে। কারও ওপর অতি প্রশংসা লেপ্টে দিয়ে আইকন বানানো হয়, যাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ ঐ আইকনকে ঘিরে মোহাবিষ্ট থাকে। মোহাচ্ছন্ন জনতাকে ব্যবহার করে অভিজাতরা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখত।

নানা কৌশলে অভিজাততন্ত্র সামাজিক শ্রেণিবিভাগকে আরও দৃঢ় করে তোলে। দেখা গেছে, অভিজাততন্ত্র প্রায়ই বংশানুক্রমিক হয়। এতে যোগ্যতার চেয়ে পারিবারিক পরিচয় বা আর্থিক অবস্থা বেশি গুরুত্ব পায়। তখন অযোগ্য ব্যক্তি ক্ষমতায় আসতে পারে। অভিজাত অযোগ্য শাসক সামাজিক অসন্তোষ আনে। ফলে বিপ্লবের ঢেউ জাগে জনমনে। বৈষম্য এবং শোষণের কারণে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট হয়ে উঠতে পারে। সরকার বদলের তীব্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তখন সমাজের বিশাল অংশের বিরাট ক্ষতি হয়, অভিজাতদেরও পতন হয়। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির দাবিতে দেশের প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির উদাহরণ কম না। ভারতে নেহরু-গান্ধী পরিবার, পাকিস্তানে ভুট্টো-জারদারি পরিবার এবং শ্রীলঙ্কায় বন্দরনায়েকে ও রাজাপাকসের পরিবার তাদের দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে, অভিজাততন্ত্রের কিছু ইতিবাচক দিক পাওয়া যায়। কখনো এই ব্যবস্থা থেকে দক্ষ নেতৃত্ব আসতে পারে। কিন্তু অযোগ্য নেতৃত্বের সম্ভাবনা বেশি বলেই এর সীমাবদ্ধতাগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে। কেননা সীমাবদ্ধতাগুলো একটি ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা হয়ে যায় এর প্রমাণ ইতিহাসে বিস্তর আছে।

লেখক : কবি, সাংবাদিক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক

sarwarch@gmail.com