কেন সীমান্তে উত্তেজনা 

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। প্রথমে বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করে  দেয় তারা। চালু রাখে নামমাত্র চিকিৎসা ও জরুরি ভিসা। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের গণমাধ্যমে সংঘবদ্ধ প্রোপাগান্ডা, আগরতলায় বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসে উগ্রবাদীদের হামলাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ৫৩ বছরের মধ্যে তলানিতে  ঠেকেছে। সর্বশেষ টানাপড়েন উসকে দিয়েছে সীমান্ত ইস্যু। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে রয়েছে বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম ভূমি সীমানা। দুই দেশের মধ্যে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, গরু পাচার, মাদক এবং অস্ত্র পাচার নিয়ে ইতিমধ্যে অনেকবার সীমান্ত পতাকা বৈঠক হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকটি জেলার সীমান্তে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে আপত্তি তোলার পর উত্তেজনা  তৈরি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সীমান্ত লাইন থেকে দেড়শ গজের মধ্যে কিছু করা হলে তা অপর পাশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সঠিক নিয়ম মেনে অবহিত করতে হয়। এক্ষেত্রে ভারতের বিএসএফ বাংলাদেশের বিজিবিকে জানায়নি। এ বিষয়ে সোমবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে কুড়িগ্রামের দুর্গম সীমান্ত এলাকা অনন্তপুরে ১৪ বছর আগে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ফেলানীকে মেরে ঝুলিয়ে রাখে সীমান্তের কাঁটাতারে। এটা নিয়ে তখন বিশ^ব্যাপী হইচই হয়। এরপর ২০২০ সালে বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর অঞ্চলের লাদাখ সীমান্তে সংঘর্ষ বাধে ভারত ও চীনা সৈন্যদের মধ্যে। এতে অন্তত ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশসহ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, চীন, ভুটান ও মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে। তারা বাংলাদেশ সীমান্তে আগ্রাসী হলেও অন্য ছয়টি দেশের সীমান্তে সব সময় নতজানু থাকে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানাচ্ছে গত ১১ বছরে বাংলাদেশের সীমান্তগুলোয় শুধু বিএসএফের গুলিতেই প্রাণ হারিয়েছে ২৮৯ বাংলাদেশি। বাংলাদেশ-ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশের সীমান্তে এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের এই পরিস্থিতির নেপথ্য কারণ হিসেবে বিগত ক্ষমতাসীনদের নতজানু অবস্থানকে দায়ী করেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আব্দুল হামিদ। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ও ‘চোরাকারবারি’র অভিযোগে বাংলাদেশের নাগরিকদের গুলি করে, ধাওয়া দিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করে বিএসএফ। আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে এই ধরনের বর্বরতা চলছে দীর্ঘসময় ধরে। এবার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।  জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম  চৌধুরী। বলেছেন, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে ভারত কোনোভাবেই কাঁটাতারের  বেড়া নির্মাণ করতে পারবে না। তবে ১৫০ গজের বাইরে হলে আপত্তি থাকবে না। সীমান্ত ইস্যুতে উত্তেজনার মধ্যেই ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। রবিবার বিকেলে পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে আলোচনা করতে আসেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের জানানো হয়, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার ব্যাপারে দুদেশের মধ্যে বোঝাপড়া রয়েছে। আবার গতকাল দিল্লিতে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার নূরুল ইসলামকে ডেকেছে ভারত। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে ফেলানীসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশিদের মধ্যে  ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিএসএফের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ এবং সীমান্তে নতুন পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। পারস্পরিক স্বার্থেই সীমান্ত সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। সীমান্ত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক হবে না। এর ফলে উভয়পক্ষেরই ক্ষতি হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের সঙ্গে যেহেতু আমাদের চুক্তি রয়েছে, তা মেনে চললেই কোনো সমস্যা থাকার কথা না। সীমান্তে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো দেশের স্থাপনা থাকতে পারবে না, এটিই নিয়ম। তাহলে কেন ভারত হঠাৎ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, তা বোধগম্য নয়। যে ধরনের সমস্যার উদ্ভবই হোক না কেন, কেবলমাত্র পারস্পরিক আলোচনাই সমস্যার সম্মানজনক সমাধান আনতে পারে।

একটি কথা না বললেই নয়, কেবলমাত্র বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা নয়। চীন, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এবং আফগানিস্তান সবার সঙ্গেই কমবেশি সমস্যা লেগেই রয়েছে। সেখানে তারা নতজানু। কেবলমাত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আগ্রাসী। অহিংস নীতির দেশে যদি হিংসার চাষ হয়, তাহলে ফসল হিসেবে উগ্রতা এবং অসহিষ্ণুতাই জন্ম নেবে। যা আমরা প্রত্যাশা করি না।