কলেজে উচ্চমান সহকারী পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে ডুমুরিয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. রায়হান সরদারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। তবে রায়হান সরদার চাকরিও পাননি, ফেরত পাননি টাকাও। তাই বাধ্য হয়ে ঘুষের টাকা ফেরত পেতে সবশেষ আদালতে মামলা করেছেন তিনি।
শুধুই মো. রায়হান সরদার না খুলনা মেট্রোপলিটন কলেজের অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ভূরি ভূরি। চাকরি দেওয়ার নামে শতাধিক ভুয়া নিয়োগপত্র বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কমপক্ষে সাত কোটি টাকা। তবে নিয়োগপ্রাপ্তরা চাকরি, যোগদান ও বেতন কিছুই পাননি। ফেরত পাননি ঘুষ দেওয়া টাকাও। তাই নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে প্রায় কলেজে হাজির হচ্ছেন তারা। কিন্তু অধ্যক্ষ কলেজে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় খালি হাতেই ফিরছেন। যা নিয়ে বিব্রত কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকরা। কলেজ সূত্র জানায়, খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গার সবুজবাগ এলাকায় ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মেট্রোপলিটন কলেজ। কলেজটি প্রথমে ছোট্ট টিনশেডের কয়েকটি রুম দিয়ে শুরু হলেও সেটি রূপান্তরিত হয়েছে চারতলা ভবনে। কলেজে চালু আছে একাদশ, দ্বাদশ, ডিগ্রি ও অনার্স কোর্স। তবে কলেজটিতে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন দিবাকর বাওয়ালী। দায়িত্ব পালনকালে বিগত ২২ বছরে নজিরবিহীন নিয়োগ-বাণিজ্যে মেতে ওঠেন তিনি। চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেন বিপুল অঙ্কের টাকা। তবে কর্মচারী নিয়োগে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য করেন ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত। অবশ্য ৫ আগস্ট গণআন্দোলনে সরকার পতনের পর মাত্র ১৩ আগস্ট পর্যন্ত তিনি কলেজের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। এর পর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন তিনি।
মেট্রোপলিটন কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক এ এইচ এম মাহাবুবুর রহমান শামীমসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে জানান, অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালী কলেজটি ঘিরে ব্যাপক নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। কলেজে তার একক আধিপত্য ছিল। সে কারণে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে কর্মচারী নিয়োগে লাগামহীন ছিলেন। বিশেষ করে ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ এবং একাদশ, দ্বাদশ, ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায়ে কর্মচারী পদে শতাধিক জনবল নিয়োগ দেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগে পরিপ্রেক্ষিতে কলেজের হিসাব অনুযায়ী নিয়োগের মাধ্যমে কমপক্ষে সাত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অধ্যক্ষ। প্রদানকৃত নিয়োগপত্রগুলোতে অধ্যক্ষের স্বাক্ষর রয়েছে। একই দিনে একজনকে দুই পদেও নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তরা প্রতিদিন নিয়োগপত্র হাতে কলেজে উপস্থিত হচ্ছেন। ইতিমধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত ৩০ জন লিখিতভাবে কলেজে অভিযোগও করেছেন।
শিক্ষকরা আরও জানান, শুধুই নিয়োগ প্রতারণা নাÑ অধ্যক্ষ কলেজের উপবৃত্তি থেকে প্রাপ্ত টিউশন ফিসের টাকা, কারিগরি বোর্ড থেকে প্রাপ্ত টাকা, এইচএসসি-২০২৩ ও ২০২৪ সালের কেন্দ্র ফিসের টাকা, কলেজে অনুষ্ঠিত এনটিআরসি’র নিয়োগ পরীক্ষার টাকাসহ বিভিন্ন ফান্ডের টাকাও আত্মসাৎ করেছেন। কিন্তু কোনো টাকাই কলেজে খরচ করেননি। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী খুলনা নগরীর নিরালার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম দেশ রূপান্তরকে জানান, কলেজে কর্মচারী পদে নিয়োগের জন্য অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালীর কাছে ৪ জন প্রার্থীর জন্য ১৬ লাখ টাকা প্রদান করেন তিনি। কিন্তু অধ্যক্ষ যে নিয়োগপত্র প্রদান করেছেন তা ভুয়া। যার কারণে চাকরি ও বেতন কিছুই হয়নি। এখন অধ্যক্ষকে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না।
দুই চাকরি প্রার্থী সালমান শেখ ও আলামিন হক গাজী জানান, তারা দুজনে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির জন্য ১০ লাখ টাকা দেন। নিয়োগপত্র দিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন মাত্র তিন মাসেই বেতন হবে। কিন্তু যোগদানও হয়নি, বেতনও হয়নি, টাকাও ফেরত দেননি অধ্যক্ষ। টাকা দিয়ে এখন তারা নিঃস্ব।
এ ব্যাপারে কলেজেন বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মো. মাসুদ পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগে ২০ থেকে ২২ লাখ ও কর্মচারী পদে ৭ থেকে ৮ লাখ করে টাকা পর্যন্ত নেন অধ্যক্ষ। তাদের চাকরিতে যোগদান হয়নি। অনেকের যোগদান হলেও বেতন হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া নিয়োগপত্র প্রদান করে মোটা অঙ্কের টাকা লুফে নিয়েছেন তিনি। এছাড়া বিগত বছরগুলোতে কলেজে অভ্যন্তরীণ আয়ের কোনো হিসাবই দেননি। আয়ের সব টাকাই তার নিজস্ব ফান্ডে জমা করেন। অধ্যক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই এসব অনিয়ম-দুর্নীতি ও প্রতারণা করে এলেও ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সভাপতি আরও বলেন, নিয়োগ বাণিজ্য, প্রতারণা, পরিচালনা কমিটির অনুমোদন ছাড়া বিদেশ গমন ও কলেজে অনুপস্থিত থাকাসহ বেশ কিছু কারণে অধ্যক্ষ গত বছর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে দুবার কারণ দর্শানো নোটিস দেওয়া হয়। তবে কোনো উত্তর আসেনি। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ অবস্থায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও প্রতারণার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।