‘আমি নওয়াজের মতো আপস করব না’

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, তাকে যে শাস্তিই দেওয়া হোক না কেন, তিনি নওয়াজ শরীফের মতো আপস করবেন না। শুক্রবার পাকিস্তানের আদালত ইমরান খানকে আল কাদির বিশ্ববিদ্যালয় প্রজেক্ট ট্রাস্টের এক মামলায় ১৪ বছর এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন।

এ ছাড়াও ইমরানকে ১০ লাখ এবং বুশরাকে ৫ লাখ পাকিস্তানি রুপি জরিমানা করা হয়েছে।

এই রায়ের দুদিন আগে, বুধবার ইমরান এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে বলেছিলেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, যে কৌশলই ব্যবহার করা হোক না কেন, কোনো চুক্তি করব না। আমি নওয়াজ শরীফ নই, যিনি দুর্নীতির মাধ্যমে কামানো কোটি কোটি টাকা মাফ পেয়ে গিয়েছিলেন। আমি পাকিস্তানে থাকব এবং পাকিস্তানেই মারা যাব, আমি সবসময় আমার দেশের জন্য দাঁড়াব।’ উল্লেখ্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ দুবার দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। প্রথমবার ২০০০ সালের দিকে তৎকালীন সেনাশাসক পারভেজ মোশারফের সঙ্গে চুক্তি করে এবং পরেরবার ২০১৯ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল উমর জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে চুক্তি করার পর।

ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি। রাওয়ালপিন্ডির আদালত ডিসেম্বরে রায় বদলে দেন এবং তিনবার রায় ঘোষণা পিছিয়ে দেন। ১৩ জানুয়ারি তিনি আদালতে গরহাজির থাকেন এবং তৃতীয়বারের মতো রায়ের ঘোষণা বিলম্বিত হওয়ার পর দাবি করেছিলেন যে, তাকে চাপ দেওয়ার জন্য রায় পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটি চতুর্থ বড় মামলা, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ঘোষিত তিনটি পূর্বের দোষী সাব্যস্ত, রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁস এবং বেআইনি বিবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, যার সবই বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, খান কারাগারে অন্তরীণ আছেন, তার বিরুদ্ধে কয়েক ডজন মামলা বিচারাধীন এমন পরিস্থিতিকে তিনি রাজনৈতিক ‘উইচ-হান্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইমরানের আইনজীবী ফয়সাল ফরিদ চৌধুরী ইমরান এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘ভুয়া নিপীড়নের’ ধারাবাহিকতা হিসেবে এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি সম্ভবত একমাত্র মামলা, যেখানে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো (এনএবি) একটি পয়সাও ক্ষতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।’ 

তিনি আরও দাবি করেন, ‘এনএবি রাষ্ট্রের কোনো আর্থিক ক্ষতি বা আল-কাদির ট্রাস্ট এবং খান বা তার পরিবারের জন্য ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের মধ্যে কোনো সংযোগের প্রমাণ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রসিকিউশন চলাকালীন খান ও বুশরা বিবির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা প্রমাণিত হয়নি। পুরো মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি বুঝতে ব্যর্থ যে, কীভাবে একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা স্বার্থের দ্বন্দ্ব গঠন করে।’ পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দল রায়ের পরপরই প্রথম বিবৃতিতে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বলেছে‘যদিও দলটি বিস্তারিত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে, এটি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইমরান খান এবং বুশরা বিবির বিরুদ্ধে আল-কাদির ট্রাস্ট মামলার কোনো শক্ত ভিত্তি নেই এবং এটি ভেঙে পড়তে বাধ্য। সমস্ত প্রমাণ এবং সাক্ষীর সাক্ষ্য নিশ্চিত করে যেকোনো অব্যবস্থাপনা বা অন্যায় হয়নি। ইমরান খান এবং বুশরা বিবি নিছক ট্রাস্টি ছিলেন এবং এ বিষয়ে আর কোনো সম্পৃক্ততা তাদের নেই।’

চার্জশিটটিতে ইমরান এবং তার স্ত্রীকে দরিদ্রদের জন্য একটি অলাভজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের বিশিষ্ট ধনকুবের মালিক রিয়াজের কাছ থেকে আল-কাদির ট্রাস্টের জন্য কয়েক বিলিয়ন রুপি মূল্যের জমি অধিগ্রহণ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এনএবি অভিযোগ করেছে যে, ইমরান খান আগস্ট ২০১৮ থেকে এপ্রিল ২০২২ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, রিয়াজের সঙ্গে একটি কুইড প্রো কো চুক্তি করেছিলেন, যা তাকে ২৩৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি পাচার করতে সাহায্য করেছিল। এতে জাতীয় কোষাগারের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এনএবির মতে, পিটিআই সরকার রিয়াজের কালো টাকাকে আইনি কভার দিয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি উদ্ধার করেছে এবং পাকিস্তান সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে।

ইমরান খানকে ২০২২ সালে সংসদে এক অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং তিনি এর পেছনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের চক্রান্তকে দায়ী করেন। এরপর নওয়াজ শরীফের ভাই শাহবাজ শরীফ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সরকার গঠন করেন। ইমরানের বিরুদ্ধে রায়টি এমন সময় ঘোষিত হলো, যখন ইমরানের দল পিটিয়াইয়ের সঙ্গে শরীফের ক্ষমতাসীন দলের আলোচনা চলছে। অনেকেই পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন যে, এই আলোচনা সফল হলে ইমরান খান জেল থেকে বেরিয়ে আসবেন। তবে এই রায়ের ফলে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলছেন, এর ফলে খোদ পিটিআইতেই দুই ভাগ হয়ে যেতে পারে। যাদের একভাগ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে এবং অপর দল আরও তীব্র সরকারবিরোধী অবস্থান নেবে।

তবে ইমরান খান যে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তা স্পষ্ট। তার কারাবন্দি দলীয় কর্মীদের সঙ্গে ‘অমানবিক’ আচরণের জন্য সামরিক সংস্থা এবং সরকারকে নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, তিনি বিষয়টি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যাবেন। বলেছেন, ‘আমরা মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। সুপ্রিম কোর্ট, লাহোর হাইকোর্ট এবং ইসলামাবাদ হাইকোর্টে পিটিশন দায়ের করেছি, কিন্তু শুনানি হয়নি’, ‘এই নিরপরাধ নাগরিকদের কথা শোনার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আমি বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে লিখব। বিদেশি পাকিস্তানিদের এ বিষয়ে তাদের আওয়াজ তুলতে আহ্বান জানাচ্ছি।’

ইমরান খান বলেন, ‘পাকিস্তানের অর্থনীতি এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। বিদেশি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে কম। এই অবস্থায় একমাত্র সমাধান হচ্ছে, এমন একটি সরকার গঠন, যা জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম।’

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

faiz@dhaka.net