দীর্ঘ সময় ধরে বাজার চলে গেছে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। কোনো সরকারই তাদের কবজা করতে পারেনি। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে ক্রমাগত বাড়ছে। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের তেমন কেউই পণ্যমূল্যের বৃদ্ধিতে তীব্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি। হয়তো এক্ষেত্রে তারাও অসহায়। তবে কি ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা’র বিষয়টি, কেবলই কথার কথা?
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমস্যার কারণে কখনো কখনো বাজারে পণ্য সরবরাহ বিঘিœত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট, পণ্য উৎপাদন হ্রাসের ফলে পণ্যমূল্য বেড়েছে। সাধারণ মানুষ বাস্তবতা মেনে নিয়ে শতকষ্টের মধ্যেও তা মেনে নিয়েছে। তবু তাদের ক্ষোভ দূর করতে পারেনি বিগত সরকার। গত বছর আগস্টে ছাত্রদের সঙ্গে মিলিত হয়ে গণআন্দোলনে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সরকার পতন করেছে। এরপর কিছুদিনের জন্য সিন্ডিকেটের মূল হোতারা গা ঢাকা দিয়েছিলেন। কিছুদিন না যেতেই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অস্থিরতা শুরু হয় পণ্যমূল্যে। নতুন করে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জোয়ারে ভাসিয়ে নিচ্ছে দেশকে। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছিল আগেই, এবার পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় কিছুদিনের জন্য পণ্যমূল্য কমেছিল। এরপর আবার শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তিন বছর ধরে ব্যয়ের তুলনায় আয় না বাড়ায় অনেকে পাত সাজাচ্ছেন নিম্নমানের তরকারি দিয়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন করের বোঝা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর আরও চাপ বাড়িয়েছে। শীতকালীন সবজির দাম কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও, দেশের মানুষের খাদ্যের প্রধান অনুষঙ্গ চাল ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ভোক্তাদের হাঁপিয়ে তুলেছে। আগে থেকেই চড়া দামে বিক্রি হওয়া ফলের দাম আরও বাড়ায় অনেকে কেনার সামর্থ্য হারিয়েছেন। ফলের জুস ও ব্যবহারযোগ্য টিস্যুর নতুন দামের চাপ বিপাকে ফেলেছে মানুষকে। ভ্যাট বিভাগের নির্দেশনা জারির সঙ্গে সঙ্গে ফলের বাজারে কার্যকর হওয়া শুরু হয়েছে। তাতে সব ধরনের ফলের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একদিকে নতুন করে এনবিআরের করের চাপ, অন্যদিকে খাদ্যপণ্যের মধ্যে সব ধরনের মাছ ও মাংসের চড়া দাম ভোক্তার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে মাছ ও মাংস। বাজারে খাদ্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের দামের আস্ফালন ভোক্তার নীরব কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলছেন ‘ভ্যাট বাড়ানোর কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। খুব অল্প ক্ষেত্রে ভ্যাটের কারণে দাম বেড়েছে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির কারণ বাজারের কারসাজি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা।’ তিনি জানান, ‘ওষুধ ও পোশাকসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বাড়তি ভ্যাট আরোপের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বলেন, ‘ভ্যাটের কারণে অল্প কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যেমন মোবাইল ফোন বা বিদেশি ফলের জুস। এসব পণ্য তুলনামূলক কম মানুষ কেনে। তবু এ বিষয়গুলোও আমরা রিভিউ করছি।’ বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘বাজারে চালের ঘাটতি নেই। নিজস্ব মজুদ ও স্থানীয় উৎপাদনে ঘাটতি নেই। আমরা আমনের ভরা মৌসুম পার করছি। ঠিক এই মুহূর্তে বাজারে এমন দামের যৌক্তিক কারণ দেখছি না। সাময়িক মজুদদারির জন্য চালের বাজার অস্থিতিশীল। মনিটরিং করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।’ বাণিজ্য উদারীকরণের কারণে বাজারে পণ্যের ঘাটতি নেই উল্লেখ করে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘বাজার নিয়ে রমজানে কোনো সমস্যা হবে না। প্রয়োজনীয় মজুদ রয়েছে।’ জানিয়েছেন ‘আমরা কারণ খোঁজার চেষ্টা করছি, বোঝার চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে এটা অযৌক্তিক মনে হচ্ছে। আশা করি কিছুদিনের মধ্যে দাম নেমে আসবে।’
রাজস্ব বাড়ানোর ফলেই কি সিন্ডিকেটের পোয়াবারো হলো! এই কারণেই কি বাজার সন্ত্রাস করে পণ্যমূল্যের উল্লম্ফন? অন্যদিকে নিয়মিতভাবে ঘটছে ২০-৩০ শতাংশ কর ফাঁকির ঘটনা। তার সমাধানে এনবিআরের তেমন উদ্যোগ নেই। কিন্তু বাড়ানো হচ্ছে না করপোরেট ট্যাক্স, ইনকাম ট্যাক্স নেট। অথচ দুর্নীতিপরায়ণদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, ভ্যাট বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ংকর যন্ত্রণার মধ্যে ফেলা হলো। ভোক্তার কান্না নীরব থেকে সরব হবে, নাকি জীবনযাপনে সুস্থ পথ দেখাবে সরকার?