নতুন ধারায় ফ্যাশন ও সৌন্দর্যচর্চা

নতুন বছর মানেই নতুন কিছু ফ্যাশন ট্রেন্ডে যোগ হওয়া। আর সেই ট্রেন্ড অনুসরণ করেন ফ্যাশনপ্রেমীরা। ২০২৫ সালের ফ্যাশন আর সাজসজ্জা কেমন হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঘরানায় তা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

ফ্যাশন জগতে-২০২৫

প্রতি বছরই পুরনোকে পেছনে ফেলে নিত্যনতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড যোগ হয়। আর ডিজাইনারদের হাতের মুনশিয়ানাতেই নতুন ট্রেন্ড সেট হয়। সেই ট্রেন্ড এগিয়ে নিয়ে যান বলিউড সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে বড় বড় ফ্যাশনিস্তারাই। ওভার সাইজড স্যুট থেকে ভাইব্র্যান্ট রঙ, কিটেন হিল এসব কিছুই ফ্যাশন ট্রেন্ডে যোগ হবে এ বছর।

ডিকনস্ট্রাকচার্ড ডেনিমের পোশাক

নাগরিক জীবনে প্রায় সবারই একটা-দুটো ডেনিম পোশাক রয়েছে। জিনস থেকে শুরু করে শার্ট, কুর্তা, শ্রাগ, জ্যাকেট, স্কার্ট, চাদর, শাড়ি সবকিছুই ডেনিম দিয়ে তৈরি। সারা বছরই ডেনিমের যেমন চাহিদা আছে, তেমনি আছে জনপ্রিয়তা। এবার এই ডেনিমেই ডিকনস্ট্রাকচার্ড ডিজাইন দেখা যাবে। যেমন- ডেনিমের ওপর প্যাচওয়ার্ক, অ্যাসিমেট্রিক্যাল কাট, স্টোন ওয়ার্ক ডিজাইনে যুক্ত হবে। আবার বড় কলারযুক্ত জ্যাকেটও থাকবে। জিনস প্যান্টের হেমলাইন হতে পারে অসম, নানা রঙের সুতার স্ট্রিচ। তেমনই রঙের নানা বাহার দেখা যাবে পোশাকে। প্যাস্টেল গ্রেডিয়েন্ট থেকে বোল্ড কমলা ও সবুজ রঙ চোখে পড়বে। তবে ক্লাসিক ব্লু ডেনিমের আবেদন কমবে না কখনো। কালো ডেনিমও থাকবে কারও কারও পছন্দের তালিকায়। সাথে থাকবে নানা ধরনের কাট।

অ্যাথলেইজার

গত দুবছর ধরেই ফ্যাশনে আধিপত্য বিস্তার করেছে অ্যাথলেইজার। ফ্যাশন ট্রেন্ডে মানুষ আরামের বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সে জন্যই ওয়ার্ক আউট, ফেন্ডস আড্ডা বা ট্রাভেলিংয়ের জন্য সেলিব্রিটিরা এমন অ্যাথলেইজার বেছে নিচ্ছেন। অ্যাথলেইজার হলো, স্পোর্টসওয়্যারকেই একটু ফ্যাশনেবল করে পরা। যাতে প্রতিদিনকার ক্যাজুয়াল পোশাক হিসেবেও মন্দ না লাগে। যেমন প্রিমিয়াম ফ্যাব্রিকের ট্রাউজার্সের সঙ্গে একটা ব্লেজার পরে নেওয়া বা এ রকমই কোনো টি-শার্ট বা ড্রেস পরা, যা দেখতে ফরমাল অথচ খুব আরামদায়ক।

বাবল স্কার্ট ও ড্রপ-ওয়েস্ট টপ

সেলিব্রিটিদের পোশাক, লুক নিয়মিত ফলো করলেই বোঝা যায় ফ্যাশন ট্রেন্ডে কী যোগ হচ্ছে। নতুন বছরে অনেক হলিউড ও বলিউড তারকা সেলিব্রিটিকেই ড্রপ-ওয়েস্ট টপ ও বাবল স্কার্ট পরতে দেখা যাচ্ছে। এ বছর গ্রীষ্মে এ ধরনের পোশাকের দাপট থাকবে।

ক্ল্যাসিক মাস্ক স্যুট

গত বছরের ক্ল্যাসিক মাসকুলিন স্যুট বেশ রাজত্ব করবে। এ বছরেও সেই ওভারসাইজড স্যুট পরার ট্র্যাডিশন বজায় থাকবে সঙ্গে জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে। ওভারসাইডজ এমন প্যান্ট-স্যুটে হাল্কা ও গাঢ় দুটো রঙই বহল থাকবে। সঙ্গে নানা ধরনের চেক, স্ট্রাইপও যোগ হবে।

অনুষঙ্গ থাকবে

পোশাকের সঙ্গে ব্যাগ, সুজ ও জুয়েলারিরও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে ফ্যাশন ট্রেন্ডে। ওভারসাইজড ব্যাগ, জাঙ্ক জুয়েলারি, ড্রামাটিক সানগ্লাস একইভাবে সারা বছর ফ্যাশনে গুরুত্ব পাবে। জুয়েলারিতে মুক্তা ও ধাতব ফিনিশ এখন বেশ ট্রেন্ডিং। ব্যাগ হিসেবে টো ব্যাগ এবং সুজ হিসেবে ফ্যাশনসচেতন নারীরা এ বছর উঁচু হিলের পরিবর্তে আরামদায়ক লোফার, ওয়েজ, ফ্ল্যাট ব্যালেরিনা অথবা স্নিকার্সের দিকে ঝুঁকবেন। আবার হিল জুতা যে ফ্যাশন ট্রেন্ডে থাকবে না তা নয়। তবে স্টিলেটো হিলের পরিবর্তে ব্লক হিল এবং কিটেন হিল রাজত্ব করবে। কারণ ফ্যাশনে আরামদায়ক ব্যাপারটা

যে প্রাধান্য পাচ্ছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে পায়ের জুতার ক্ষেত্রেও।

সৌন্দর্যচর্চায়-২০২৫

ফ্যাশনের সঙ্গে সৌন্দর্য চর্চায়ও ছোট-বড় পরিবর্তন দেখা যায়। গত বছর যা ছিল তার অনেক কিছু এ বছর দেখা যাবে না।

মিনিমাল স্কিন কেয়ার

গত বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরও জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকবে মিনিমাল বা বেসিক স্কিন কেয়ার রুটিন। ত্বকের যত্নে ৫টি ধাপের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে রুটিনে অনেকগুলো প্রোডাক্টের পরিবর্তে রাখা হয় শুধু সেই প্রোডাক্টগুলো, যেগুলো নিয়মিত ব্যবহারে ত্বক থাকে ক্লিন, ময়েশ্চারাইজড ও হেলদি। মিনিমাল স্কিন কেয়ার রুটিনের উদাহরণ হচ্ছে ঈগচ রুটিন, এখানে ঈ-এর অর্থ ক্লেনজিং, গ-এর অর্থ ময়েশ্চারাইজিং এবং চ-এর অর্থ প্রোটেকশন। এই রুটিন অনুযায়ী স্কিন কেয়ারে ত্বকের ধরন অনুযায়ী ক্লেনজার, ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন। এর সঙ্গে বাড়তি হিসেবে সেরাম ব্যবহার করতে পারেন। সৌন্দর্যসচেতনরা স্কিন কেয়ার রুটিনে এ বছরও গুরুত্ব দেবেন মিনিমাল স্কিন কেয়ারে।

সুন্দর ত্বকে মনোযোগ

ত্বক ফর্সার করার চেয়ে হেলদি ত্বকের প্রতিই সবার মনোযোগ। ফেয়ারনেস ক্রিমের চেয়ে হেলদি স্কিন ধরে রাখতে নানা ধরনের বিউটি পোডাক্টের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। স্কিন ব্যারিয়ার ড্যামেজড হলে ভালো মানের প্রোডাক্ট ব্যবহার করলেও মনমতো রেজাল্ট পাওয়া যাবে না, তাই সবাই এখন ফোকাস করছেন হেলদি স্কিন ব্যারিয়ার মেনটেইন করার দিকে এবং ত্বক পরিচর্যায় যোগ হয়েছে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, সেরামাইড ইত্যাদি ইনগ্রেডিয়েন্ট, যা ত্বককের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে দারুণ কাজ করে।

ঠোঁটের চাই সান প্রোটেকশন

সানস্ক্রিন শুধু ত্বকের জন্য না। বরং ঠোঁটের জন্যও প্রয়োজন হয়। এসপিএফ বেইজড লিপবামের কনসেপ্টটি বেশ ট্রেন্ডি ছিল গত বছর। ঠোঁটের পিগমেন্টেশন এড়াতে বাইরে বের হওয়ার আগে এসপিএফ যুক্ত লিপবাম ব্যবহার করা যে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, তা ইতিমধ্যে অনেকেই জেনে গেছেন। তাই এ বছর সৌন্দর্যসচেতন নারীর প্রসাধনীর তালিকায় এসপিএফ যুক্ত লিপ বাম থাকবে।

স্বাস্থ্যকর স্ক্যাল্প

চুল ভালো রাখতে মাথার স্ক্যাল্পের পরিচর্যা খুব বেশি জরুরি। স্ক্যাল্প ভালো থাকলে চুলও ভালো থাকবে। স্ক্যাল্পের প্রোডাক্ট বিল্ডআপ দূর করতে, অতিরিক্ত তৈলাক্ত ভাব কমাতে এবং ডেডসেল রিমুভ করে স্ক্যাল্প ভেতর থেকে ক্লিন করতে স্ক্যাল্প এক্সফোলিয়েশন গত বছরের মতো এ বছরও জনপ্রিয়তা পাবে। বিশেষ করে স্ক্যাল্পে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বা গ্লাইকোলিক অ্যাসিডের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো।

কমপ্লিট বডি কেয়ার

মুখের ত্বকের পাশাপাশি বডিকেয়ারও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে শরীরে জমে থাকা ডেডসেল দূর করতে বডি এক্সফোলিয়েশন এবং সানট্যান এড়াতে শরীরও সঠিক পরিমাণে সানস্ক্রিন দেওয়া জরুরি। এই ট্রেন্ড ২০২৫ সালে আরও জনপ্রিয়তা পাবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন সৌন্দর্য চর্চায় মনোজাগতিক সৌন্দর্য

২০২৫ সালে স্কিনকেয়ার রুটিনে ওয়েলনেস মেকওভার যুক্ত হবে। সুইডিশ ডার্মাটোলজিস্ট লিনিয়া ওয়াগনাস বলছেন, স্কিনকেয়ার এখন ক্রমবর্ধমানভাবে সামগ্রিক ওয়েলনেসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। শুধু ত্বকের স্বাস্থ্য নয়, মানসিক সুস্থতার সঙ্গে জড়িত। যেমন অ্যারোমাথেরাপি ক্রিম, লিম্ফেটিক ড্রেনেজ টুলস এবং মাইন্ডফুলনেস-ওরিয়েন্টেড স্কিনকেয়ার রুটিনগুলো আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই ট্রেন্ড তাদের জন্য পারফেক্ট, যারা তাদের সকালের রুটিনে মাইন্ডফুলনেস কিংবা প্রাণোচ্ছলতা যুক্ত করতে চায়। স্কিনকেয়ার পণ্যগুলো তাদের গন্ধ, উপাদান এবং টেক্সচারের মধ্য দিয়ে মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই পণ্যগুলো প্রশান্তিদায়ক ফরমুলেশন এবং এমন উপাদান দিয়ে তৈরি, যা ত্বকে স্ট্রেস হরমোনগুলো সক্রিয়ভাবে কমায়। যারা প্রতিদিনের স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যায় তাদের জন্য এই ট্রেন্ড উপযুক্ত। বিশেষ করে যারা মানসিক কারণে স্ট্রেস, বার্ন আউট কিংবা ত্বকের সংবেদনশীলতা নিয়ে সমস্যায় আছে।

গ্লোবাল ফ্যাশনে তিনটি মূল বিষয় প্রাধান্য পাবে

২০২৫ সালে ফ্যাশনে সাসটেইনেবিলিটি, ইনডিভিজুয়ালিটি এবং নস্টালজিয়া এই তিনটি মূল বিষয় দেখা যাবে এমনটাই জানালেন স্ট্যাজিক এইচ আর অ্যান্ড কমপালেন্স লিডার শামিম নূর আলম। তিনি জানান, সাসটেইনেবিলিটি : ২০২৫ সালে পরিবেশবান্ধব পোশাক তৈরি এবং ব্যবহার এখন ফ্যাশন জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে যাবে। রিসাইক্লেড ম্যাটেরিয়াল : অর্গানিক কটন এবং ভেগান লেদারের ব্যবহার বাড়বে। ইনডিভিজুয়ালিটি : প্রত্যেকেই এখন নিজের মতো করে পোশাক পরতে চায়। ইউনিক ডিজাইন এবং কাস্টমাইজেশন ফ্যাশনের নতুন ট্রেন্ড বছর জুড়ে গুরুত্ব পাবে। নস্টালজিয়া : ৯০-এর দশকের ফ্যাশন ট্রেন্ড আবার ফিরে আসছে। ওভারসাইজ জিনস, ক্রপ টপ এবং স্পোর্টি সুজ এ বছর আবার জনপ্রিয় হবে।