নবীরা হলেন সব যুগের আদর্শ। ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জাতিধর্ম নির্বিশেষে গোটা মানবজাতির জন্য প্রয়োগযোগ্য সর্বজনীন সব উত্তম আদর্শ ও কল্যাণ নিয়ে তারা দুনিয়ায় আগমন করেছেন। তাদের বাণীর সর্বজনীনতার আওতায় মুমিনরা তো বটেই, এমনকি গোটা বিশ্ব, জীবজন্তু, কীটপতঙ্গসহ সব মাখলুক কল্যাণ ও শান্তির আশ্বাস পান। তারা ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্র মাধুরী, সর্বোত্তম আদর্শ, মহৎ মানুষ ও সর্বোত্তম প্রতিবেশী ইত্যাদি মহত্তম গুণের অধিকারী। বাল্যকাল থেকেই তাদের স্বভাব ছিল কলুষতা, কাঠিন্য ও অহংকার থেকে মুক্ত। তারা ছিলেন নিষ্কলুষ ও নির্ভেজাল মহামানব। হিম্মত, দৃঢ়তা, সাহস, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, নির্ভরতা, ভাগ্যের ওপর সন্তুষ্টি, বিপদাপদ সহ্য করা, ত্যাগ, অল্পে তুষ্টি, স্বাবলম্বিতা, কোরবানি, দানশীলতা, নম্রতাসহ ছোট ও বড় সব রকমের নৈতিক গুণাবলি একসঙ্গে তাদের মধ্যে পাওয়া যায়। এগুলো মহান আল্লাহ নিজ হাতে তাদের দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ নবীদের বিভিন্ন চরিত্র মাধুরীতে অভ্যস্ত ও জাগ্রত করার নিমিত্তে বিভিন্ন সময় তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সেই সব অগণিত প্রশিক্ষণের মধ্য থেকে একটা হলো ধৈর্যের প্রশিক্ষণ। এজন্য তাদের দ্বারা ছাগল চরিয়েছেন। কারণ ধৈর্য আর ছাগল চরানো, এই দুটিকে একটি অপরটির সম্পূরক বলা হয়ে থাকে। কেননা একজন ধৈর্যশীল ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ ছাগল লালন-পালন করতে পারেন না। ছাগল লালন-পালন ধৈর্যশীলদের জন্যই। পৃথিবীতে নবীরা সবচেয়ে বেশি ধৈর্যশীল ছিলেন। মহান আল্লাহ নবীদের রাগকে নিয়ন্ত্রণ রাখার ও ধৈর্যধারণ করার জন্য প্রত্যেক নবীকে দিয়ে ছাগল চরিয়েছেন। এটা দোষের কিছু নয়। আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তার দুধমা বিবি হালিমার ঘরে অবস্থানকালে দুধভাইদের সঙ্গে ছাগল চরাতেন। অনুরূপভাবে তিনি যৌবনেও ছাগল চরিয়েছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এমন কোনো নবী নেই যিনি ছাগল চরাতেন না। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনিও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমিও কয়েক কিরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরিয়েছি।’ (সহিহ বুখারি) দিনারের সামান্য অংশকে কিরাত বলা হয়।
সকল নবী ছাগল চরিয়েছেন শুধুমাত্র বিশেষ শিক্ষার্জনের জন্য। যেমন কৃষিবিজ্ঞানীরা মাঠে চাষাবাদ না করলেও শিক্ষার্জনের তাগিদে হাতে কলমে ধানের চারা রোপণ করে থাকেন। কিন্তু তারা চাষি নন। ঠিক মহান আল্লাহও ধৈর্যের শিক্ষা দেওয়ার জন্য নবীদের মাধ্যমে ছাগল চরানোর কাজ করিয়েছেন। নবীদের ছাগল বা মেষ চরানোর কারণ হলো মহান আল্লাহ তাদের ধৈর্যশীল করতে চেয়েছেন। সেই শিক্ষা তাদের মধ্যে প্রোথিত করেছেন। গরু বা অন্য কোনো প্রাণী চরানোর ক্ষেত্রে এই লক্ষ্য অর্জিত হয় না। এজন্য গরু বা অন্য কোনো প্রাণী চরাননি। এটা থেকেই বুঝা যায় নবীদের ছাগল চরানোর মধ্যে মহান আল্লাহর বিশেষ হেকমত রয়েছে।
নবীদের ব্যাপারে সামান্যতম অসংগতিপূর্ণ শব্দচয়ন করা যাবে না। নবীরা ছাগল চরিয়েছেন এজন্য তাদের রাখাল বা এ জাতীয় নিম্নমানের শব্দে ডাকা কোনো মুমিন ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। নবীদের ব্যাপারে শব্দপ্রয়োগে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। তাদের সম্মান দেখাতে গিয়েও এমন কোনো বাক্য বলা যাবে না যা তাদের শানের সঙ্গে যায় না। তাদের ব্যাপারে শব্দ চয়নে খুবই সতর্ক থাকা জরুরি। যাতে সামান্য পরিমাণ অসংগতিপূর্ণ বা বেয়াদবিমূলক শব্দ চয়ন হয়ে না যায়।
আমরা ইতিহাসের পাতায় সামান্য চোখ বুলালে দেখতে পাব মহান আল্লাহ সাহাবায়ে কেরামকে সেই শিক্ষাই দিয়েছেন। মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিদের একটি দল ছিল অতিশয় দুষ্ট। তারা যখন রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করত, তখন তাকে লক্ষ্য করে বলত ‘রায়িনা’। আরবিতে এর অর্থ ‘আমাদের প্রতি লক্ষ রাখুন’। এ হিসেবে শব্দটিতে কোনো দোষ নেই এবং এর মধ্যে বেয়াদবিরও কিছু নেই। কিন্তু ইহুদিদের ধর্মীয় ভাষা হিব্রুতে এরই কাছাকাছি একটি শব্দ অভিশাপ ও গালি অর্থে ব্যবহৃত হতো। তাছাড়া এ শব্দটিকেই যদি আরবিতে ‘আইন’ বর্ণকে দীর্ঘ উচ্চারণে পড়া হয়, তবে ‘রায়িনা’ হয়ে যায়। যার অর্থ ‘আমাদের রাখাল’। মোটকথা ইহুদিদের আসল উদ্দেশ্য ছিল শব্দটিকে মন্দ অর্থে ব্যবহার করা। কিন্তু আরবিতে যেহেতু বাহ্যিকভাবে শব্দটিতে কোনো দোষ ছিল না, তাই কতিপয় সরলপ্রাণ মুসলিমও শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করে দেন। এতে ইহুদিরা খুব খুশি হতো এবং ভেতরে ভেতরে মুসলিমদের নিয়ে মজা করত। এজন্য মহান আল্লাহ কোরআনের আয়াত নাজিল করে বলেন, ‘হে ইমানদাররা! (রাসুলকে লক্ষ্য করে) রায়িনা বলো না; বরং উনজুরনা বলো।’ (সুরা বাকারা ১০৪) উনজুরনা অর্থ আমাদের প্রতি খেয়াল করুন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নবীদের ব্যাপারে শব্দচয়ন করার সুস্পষ্ট নীতিমালা শিক্ষা দেওয়ার পরও নবীদের ব্যাপারে বাজে শব্দ ব্যবহার করা মারাত্মক অন্যায় এবং খুবই নিন্দনীয় কাজ। শ্রোতাদের সামনে স্মার্ট সাজার নামে এ ধরনের শব্দ চয়ন অত্যন্ত গর্হিত কাজ। সুতরাং দুনিয়াতে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী নবীদের শানে যেকোনো নিন্দনীয় শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যদিও তার উদ্দেশ্য ভালো হোক না কেন। এটা একজন মুমিনের ইমানের দাবি।