নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট (৬৬০ মেগাওয়াট) থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
আধুনিক প্রযুক্তির আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (আরএনপিএল)। যৌথ বিনিয়োগে গঠিত আরএনপিএল কোম্পানিতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এবং চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন লিমিটেডের (নরিনকো) সমান (৫০:৫০) অংশীদারত্ব রয়েছে।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক তৌফিক ইসলাম গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে জানান, শনিবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। শুরুতে ১৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও আস্তে আস্তে এর উৎপাদন বেড়ে পূর্ণ সক্ষমতায় যাবে। অন্যান্য প্রস্তুতি শেষে আগামী মার্চে এটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
একই সক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষে টেস্টিং কমিশনিংয়ের কাজ চলছে উল্লেখ করে তৌফিক ইসলাম বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মে-জুন মাসের দিকে এই ইউনিট থেকেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি উৎপাদনে এলে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। সেইসঙ্গে কমবে উৎপাদন ব্যয়। পাশপাশি বকেয়া আদায়ের কৌশল হিসেবে ভারতের আদানি গ্রুপের হুটহাট করে বিদ্যুতের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার যন্ত্রণা থেকেও রেহায় মিলবে।
পটুয়াখালী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার উত্তরে কলাপাড়া উপজেলার রামনাবাদ নদীর তীরে অবস্থিত। এজন্য সেখানে ৯৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ২৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার মজুদের বিষয়ে আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৮৫ শতাংশ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে দুই ইউনিটের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন। ইতিমধ্যে ১০ লাখ টন কয়লা সরবরাহের জন্য সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান ইয়ানতাইয়ের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তির আওতায় ১ লাখ ২৮ হাজার টন কয়লা এরই মধ্যে সরবরাহ করেছে তারা। জানুয়ারিতে আরও কয়লা আসবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে চাহিদা অনুযায়ী কয়লা আমদানি করা হবে।
তিনি বলেন, পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করে ইন্দোনেশিয়ার উন্নতমানের কয়লা ব্যবহার করা হবে এই কেন্দ্রে। এটি একটি অত্যাধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেখানে কম কয়লা পুড়িয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
বিদ্যুতের দাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদানি, রামপাল, বাঁশখালী ও অন্যান্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় এই কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় কম হবে। অর্থ্যাৎ কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। বর্তমান কয়লার দাম (৭৭ ডলার) বিবেচনায় নিলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সবমিলে গড়ে ৯ টাকা ৮৫ পয়সার মতো হতে পারে বলে তিনি ধারণা দেন।
পিডিবি এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষে টেস্টিং কমিশনিংয়ের জন্য জুন-জুলাইয়ে প্রস্তুত ছিল। এজন্য পায়রা-গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইনটি অন্তত আট দিনের জন্য বন্ধ করতে হতো। এতে বিসিপিসিএলের পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এবং বরিশাল ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হবে। তখন দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা বেশি থাকায় পিডিবি বলেছিল আরও কিছুদিন পর কমিশনিং করতে। কারণ তখন কেন্দ্র দুটি বন্ধ করা হলে দেশে ব্যাপক হারে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা ছিল। এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ১ থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত আবার ওই লাইনের শাটডাউন চাওয়া হয়। কিন্তু সেটিও সম্ভব হয়নি, কারণ তখন বকেয়া আদায় করতে ভারতের আদানি গ্রুপ বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল। এমনকি বন্ধেরও হুমকি দিয়েছিল। এ ছাড়া কয়লা সংকটসহ নানা জটিলতায় মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পাশাপাশি রামপাল ও বাঁশখালীর এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে অর্ধেকে নামে। সেই পরিস্থিতির উন্নতি হলে ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে ব্যাকফিড পাওয়ারের অনুমোদন মেলে।
বর্তমানে দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ২৭ হাজার ৭৪০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৮৩ মেগাওয়াট। আরপিসিএল-নরিনকোর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা যুক্ত করলে দেশে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা দাঁড়াবে ৭ হাজার মেগাওয়াটে।