চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিরণগঞ্জ সীমান্তে ভারতের গোলমাল বাধানোই দেশটির শেষ অপকর্ম নয়। আবার শুরুও নয়। প্রতিবেশী কাউকেই ছাড় দেয় না ভারত। তফাত কেবল কম আর বেশি। তা করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে দাঁতভাঙা জবাবও পায়। কিন্তু শুধরায় না। এখন সময় ও দৃশ্যপটে ব্যাপক পরিবর্তন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দুদেশের সম্পর্ক ৫৩ বছরের মধ্যে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিভিন্ন ধরনের সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে দেশটি। এর বিপরীতে রক্ত দিয়ে হলেও সীমান্ত রক্ষার কঠোর বার্তা বাংলাদেশের।
এরপর তারা আবার টোকা দেয় সীমান্তের কোনো না কোনো জায়গা দিয়ে। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে দুই কিলোমিটার এলাকায় ভারতের কাঁটাতারের বেড়া, নওগাঁর ধামইরহাট সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ চেষ্টা, সিলেটের বিয়ানীবাজারের গোঁজ কাঁটা সীমান্ত এলাকায় দুইশ বছরের পুরনো মসজিদ পুনর্নির্মাণে বাধা এবং তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের বাংকার নির্মাণের চেষ্টা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৫ সালে সই হওয়া ‘সীমান্ত সমঝোতা’য় বলা আছে সীমান্তরেখা বা জিরো লাইন থেকে দেড়শ গজের মধ্যে কোনো পক্ষই ‘প্রতিরক্ষা সামর্থ্য’ আছে এমন কোনো স্থাপনা গড়তে পারবে না। অথচ গত কয়েকদিন ধরে সেই আইন অমান্য করে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা অনেকটা পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার মতো। এভাবে চলতে থাকলে সংঘাত আরও বাড়বে।
এ নিয়ে এবার বাংলাদেশে একটি অঘোষিত ঐক্য ও আকাক্সক্ষা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। সেইসঙ্গে তাদের মধ্যে আর চুপ না থেকে মুখ খুলে কথা বলার চর্চা শুরু হয়েছে। পদক্ষেপও নিয়ে ফেলছে। যার কিছু নমুনা গত ক’দিন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায়। যেখানে প্রতিবেশী দেশের কাঁটাতারের বেড়া বা কোনো ধরনের আগ্রাসন টের পাচ্ছে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সঙ্গে। এ এক অন্যরকম আবহ। খুব লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, সীমান্তে ভারত যত উত্তেজনা সৃষ্টি করছে বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের ভূখন্ড রক্ষায় ততবেশি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের শক্ত অবস্থানের কারণে ভারত সীমান্তের নানা জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে যোগ হয়েছে বিজিবি এবং স্থানীয় নাগরিকদের একাট্টায় দেশাত্মবোধের আরেক মাত্রা। ভারতের সঙ্গে ‘নতজানু’ পররাষ্ট্রনীতি নয়, বরং ‘সাম্যের ভিত্তিতে’ সরকারকে তা ঠিক করতে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক আহ্বান বিভিন্ন দিকে। এর ফলও মিলছে। সীমান্তে পিঠ দেখানোর দিন শেষ, বিএসএফকে বুক দেখানো শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার আধুনিক সংজ্ঞায় বিশ্বে ‘ক্ষুদ্ররাষ্ট্র’ বলতে এখন আর কিছু নেই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের জের বাংলাদেশেও। আধিপত্যবাদী শক্তি এবং ফ্যাসিবাদ ম্যাজিকের মতো কেবল হটেইনি, গোরমুখীও হয়েছে। প্রতিবেশী দেশটির আগ্রাসনের কেবল জবাব নয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করছে বাংলাদেশ। ভারতের জন্য যা ছিল ধারণারও বাইরে। তুরস্ক থেকে যুদ্ধ ট্যাংক কিনছে বাংলাদেশ। বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর দুই দেশের সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের দেখা-সাক্ষাৎ শুরু হয়েছে। অন্য মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক দৃঢ় হচ্ছে বাংলাদেশের। স্বাভাবিকভাবেই এতে চরম জ্বলছে ভারত। হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। জবাবে তিনি জানান, বাংলাদেশের ওপর নজর রাখছে ভারত। এখানে পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কাও বড় রকমের ফ্যাক্টর। সীমান্ত যন্ত্রণা তাদেরও সাধ্য মতো দিয়ে আসছে ভারত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পটপরিবর্তনও ভারতসহ এ অঞ্চলের জন্য বেশ প্রাসঙ্গিক। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিশ্বনেতাদের রোল নম্বর একে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তবে শি নিজে না গিয়ে তার প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনেক ব্যক্তিত্ব ওই তালিকায় আছেন। তবে নাম থাকেনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। বিশ্ব যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার ঐতিহাসিক পরিবর্তন দেখছে, তখন আমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয় ঢাকতে ইন্ডিয়া টুডে-এর গ্লোবাল ভারত বিভাগ দিল্লির মার্কিন রাষ্ট্রদূত এরিক গারসেটির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বসার সুযোগ নিয়েছে। রাষ্ট্রদূত গারসেটি মার্কিন-ভারত সম্পর্ক, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি এবং ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদির অনুপস্থিতির প্রভাব সম্পর্কে বলেছেন। চীনও ভারতকে কিছুটা পিঠ দেখানোর ভূমিকায়। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট আনুরা কুমারা দিশানায়েক চীন সফর করে ফিরেছেন। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপলে হাই প্রোফাইল বৈঠক করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। বৈঠকে বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড অবকাঠামো উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়। বলা হয়, এটি দুই দেশের জনগণের জন্য সুবিধা এনেছে। ভারতের জন্য তা উদ্বেগের। হিংসারও। মালদ্বীপেও দিল্লির আধিপত্যবাদী শক্তির অযাচিত নানান কায়কারবার। ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরের গোড়ায় মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুকে ‘ইমপিচ’ করতে ভারতের সাহায্য চেয়েছিল মালদ্বীপের বিরোধী দল মলদিভিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি-এমডিপি। মুইজ্জুকে পদচ্যুত করতে মালদ্বীপের পার্লামেন্টের ৪০ জন সদস্যকে ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এই ৪০ জনের মধ্যে মুইজ্জুর নিজের দল পিপলস ন্যাশনাল কংগ্রেসের বেশ কয়েক সদস্যও ছিলেন। কিন্তু যথেষ্ট সংখ্যক ভোট সুনিশ্চিত করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত মুইজ্জুকে সরানোর পরিকল্পনা কার্যকর করা যায়নি।
সীমান্ত নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলে যাচ্ছে। আয়তনে ছোট দেশও ভূ-রাজনৈতিক কারণে বড় হয়ে যাচ্ছে। আবার প্রতিবেশী বদলানো যায় না বলে আগ্রাসী প্রতিবেশীর আনুগত্য প্রকাশ করেই চলতে হবে সেই ধারণা হাল দুনিয়ায় টিকছে না। ভারত-বাংলাদেশ উভয়ের কমন সীমান্ত জ্বালা রয়েছে মিয়ানমার নিয়েও। সেখানে চলছে অভ্যন্তরীণ নাজুক অবস্থা। ভেঙে যায় যায় দশা। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়াশীল কূটনীতির ওপর নির্ভর করে এসেছে। কিন্তু মিয়ানমারের সময়ক্ষেপণের কৌশল, মিথ্যা প্রচারণা এবং চীন-রাশিয়া-ভারত অক্ষের ওপর নির্ভরশীলতা সবসময় এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে কাজ করেছে। আগের সরকারের পরাশক্তি চীন ও রাশিয়ার প্রতি নতজানু মনোভাব মিয়ানমারকে বিশ্বসভায় জবাবদিহির আওতার বাইরে রাখতে সাহায্য করেছে। এর জেরে পড়েছে ড. ইউনূসের সরকার। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন পরিস্থিতি উদ্ভব হওয়ায় বাংলাদেশকে কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
রাখাইনে বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি যেসব এলাকা দখলে নিয়েছে, সেখানকার ২৭১ কিলোমিটার বিস্তৃত সীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে লাগোয়া। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বার্মা অ্যাক্টের মতো বৈশ্বিক নীতি বাংলাদেশ-ভারতসহ আশপাশের জন্য যন্ত্রণার বিষয়। আশীর্বাদেরও বিষয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২৫-এ বাংলাদেশ অংশে রোহিঙ্গাদের কথাও এসেছে গুরুত্বের সঙ্গে। এতে বলা হয়, গুম এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীর মতো বিষয়ে সমাধানগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা উচিত। এ রকম যন্ত্রণা বা চাপের মধ্যে অন্য দেশের সীমান্ত নিজ দেশসহ আশপাশের জন্যও ভাবনার বিষয়।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের আওতায় মিয়ানমারে বিনিয়োগ, রাশিয়ার সামরিক সহায়তা এবং ভারতের কৌশলগত স্বার্থ মিলে এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। এই দেশগুলো মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার না দিয়ে বরং মিয়ানমারের সম্পদ এবং কৌশলগত স্থানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চেয়েছে। আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার নিয়ে বিভক্ত। এর কিছু সদস্য অংশগ্রহণমূলক নীতি সমর্থন করে, অন্যরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চায়। এই সংকট শুধু সীমান্ত নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মানদণ্ডেরও ইস্যু। আসিয়ানের সদস্য দেশ সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ আসিয়ানের প্রধান অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, জাপান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আটটি দেশ এখানে সম্পৃক্ত। এখানে যার যার ভাবনা যার যার মতো। মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে আসিয়ানের প্রচেষ্টার পরিপূরক হিসেবে থাইল্যান্ড মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমিকা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে নিজের স্বার্থ বিবেচনায়। ভারতের ১৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে। ভারতের এই সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান হয়। প্রায় দেড় বছর ধরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে অস্থিতিশীল অবস্থা চলছে। সম্প্রতি সেখানে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়েছে এবং এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
নিজে স্বস্তিতে থেকে অন্যকে অস্বস্তিতে রাখার দিন এখন গোটা দুনিয়ায় অচল। আবার নিজে অস্বস্তিতে ডুবে থেকে এর ভাগ অন্যদেরও ভোগানোর চর্চা ভারতের কূটনীতির অংশ। ২০১৮ সালে ভারত ‘লুক ইস্ট’ নীতির অংশ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় একটি অবাধ চলাচলের ব্যবস্থা ঘোষণা করে। ২০২৪-এ এসে ভারত সরকার ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে’ এবং মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর ‘জনসংখ্যাগত কাঠামো বজায় রাখার জন্য’ চুক্তিটি বাতিল করে। ভারত মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, সরকারি ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মিয়ানমার সফর করছেন এবং প্রকাশ্যে জান্তার সমালোচনা করেননি। আবার ভারতীয় সেনা প্রতিনিধিদল মিয়ানমার সফরও করে। চীনের সঙ্গেও মিয়ানমারের বিশাল প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এদিকে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘাতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। মিয়ানমারে বাংলাদেশি পণ্যের অনেক চাহিদা। কিন্তু চলমান সংঘর্ষের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। আরও কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশও এখন সীমান্ত যাতনার মধ্যেই আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ছে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
mostofa71@gmail.com