উনিশ শতকের শেষভাগে এই ভূখণ্ডে দুঃসময়ের গাঢ় ছায়া ইতিহাসের মর্মস্পর্শী অধ্যায় হয়ে আছে। ম্যালেরিয়া মহামারীর অভিঘাতে বিপুল প্রাণহানি হয়েছে, এমনকি কত মানুষ বাঁচার আশায় নিজের বসতভিটা ছেড়ে চলে গিয়েছিল নতুন ঠিকানায়; এর হিসাব মেলানো ভার হয়ে ওঠে। কিউলিক্স মশার বিষে ছড়ানো ম্যালেরিয়ার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও এডিস মশার বিস্তার ঠেকানো এখনো দুরূহ হয়েই আছে। খুদে এই প্রাণীটি সমাজ ও পারিবারিক জীবন কতটা ওলটপালট করে দিয়েছিল ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ছড়িয়ে রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় জীবন সায়াহ্নে এর দুঃসহ বর্ণনা করেছেন তার স্মৃতিচারণ গ্রন্থে। আর বিগত কয়েক বছর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবসে দেশ রূপান্তরসহ সহযোগী সংবাদমাধ্যমে এডিস মশার বিষে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও প্রাণহানির যে সংখ্যাচিত্র উঠে এসেছে তা উৎকণ্ঠার। ইতিপূর্বে চিকুনগুনিয়ার প্রকোপও প্রকট হয়ে উঠেছিল।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘হাজার কোটি টাকা খরচ করেও ডেঙ্গুর বাহক মশার কামড় থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারছে না সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এডিস মশা বংশ বিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে। এক সময় বর্ষাকালীন রোগ থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সারা বছরই ভোগাচ্ছে ডেঙ্গু’। আমরা জানি, মশা মারতে কামান দাগানোর মতো ঘটনাও কম ঘটেনি। প্রায় আড়াই দশকের সমস্যাটি এখন রীতিমতো সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রাণঘাতী এডিস মশার অস্তিত্ব এখন আর সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। মশক নিধনে ব্যর্থতার খতিয়ান অনেক দীর্ঘ। উষ্ণ-আর্দ্র দেশ হিসেবে আমাদের দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মশা প্রজননের জন্য উপযোগী। মশার ঘনত্ব ও প্রজাতির বৈচিত্র্য বেশি থাকায় মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। কীটতত্ত্ববিদ ও জীববিজ্ঞানীদের গবেষণায় মিলেছে, দেশে এ পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে বর্তমানে ঢাকায় ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতির মশা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ও জাপানিজ এনকেফালাইটিস অন্যতম।
আমরা জানি, মশা ভয়ংকর প্রাণী এবং আকারে ছোট হলেও এর মাধ্যমে বিভিন্ন রোগে প্রতি বছর বিশ্বে দশ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। মশাবাহিত জিকা ভাইরাসের কারণে দক্ষিণ আমেরিকায়, বিশেষ করে ব্রাজিলে হাজার হাজার শিশু অপরিণত মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে, এই তথ্য দূর অতীতের নয়। আমরা জানি, সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাস ডেঙ্গুর মৌসুম হলেও গত কয়েক বছর প্রায় বছরব্যাপীই কমবেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়ে চলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত (১৯ আগস্ট পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে মোট ৭৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি দেশের একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। কার্যকর মশা নিধন, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতার অভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও মৃত্যু ক্রমাগত বাড়ছে। এ থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে সমন্বিত ও আধুনিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি।
একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ ও অন্যদিকে কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশা দিন দিন প্রতিরোধী হয়ে ওঠাসহ বহুমাত্রিক কারণ ও দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতার ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে এর দায় সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই এড়ানোর অবকাশ নেই। ২০ আগস্ট সহযোগী একটি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, এডিস মশা মারার ছয় ওষুধের পাঁচটিতেই কাজ হচ্ছে না, ডেঙ্গু আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে অভিযোগ আছে ভেজালেরও। জনস্বাস্থ্যের এত বড় সংকট নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ব্যর্থতাই দৃশ্যমান। তবে আতঙ্ক নয় বরং প্রয়োজন সচেতনতা। আমরা চাই, প্রাণঘাতী মশা নিয়ন্ত্রণে সুসংহত পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন। সরকারি পর্যায় থেকে শুরু করে বেসরকারি পর্যায়ের সব স্তরে অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমের ভিত্তিতে প্রাণঘাতী ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রয়াস জোরদার করতেই হবে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় সমন্বয়হীনতা ঘোচানো জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক দায়ের পাশাপাশি ব্যক্তি কিংবা নাগরিক সমাজে সচেতনতা বাড়াতেও জোর দিতে হবে। ডেঙ্গু যেমন একদিকে প্রাণহানি ঘটাচ্ছে অন্যদিকে বাড়াচ্ছে আর্থিক ক্ষতি এবং এর পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সংকটও প্রকট হচ্ছে।