শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গাজীপুর, চট্টগ্রাম, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের কারখানার ফটকগুলো খুলে যায়। হাজার হাজার নারী শ্রমিক সারিবদ্ধভাবে ভেতরে প্রবেশ করেন। গত তিন দশকে এই দৃশ্যটিই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে। তৈরি পোশাক খাত আমাদের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ জুগিয়েছে, গ্রামীণ পরিবারে নগদ অর্থের প্রবাহ তৈরি করেছে এবং লাখ লাখ নারীকে প্রথমবারের মতো নিজের উপার্জনের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু সেই ফটকের ওপাশে এখন এমন একটি পরিবর্তন ঘটে চলেছে, যা জাতীয় আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। পরিবর্তনটির নাম চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। উন্নত বিশে^ এ নিয়ে বিতর্ক চলছে নিয়ন্ত্রণ, নৈতিকতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রশ্নটি অনেক বেশি মৌলিক। আমাদের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কাজ আদৌ অবশিষ্ট থাকবে কি না।

আমরা সাধারণত অটোমেশনকে আসন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করি। বাস্তবতা হলো, তা ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। ব্র্যাক বিশ^বিদ্যালয়, বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন ও সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, অটোমেশনের ফলে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমশক্তি ইতিমধ্যে ৩০.৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কাটিং বিভাগে এই হ্রাসের হার ৪৮.৩৪ শতাংশ; সোয়েটার কারখানায় প্রতিটি উৎপাদন লাইনে শ্রমিক কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। এগুলো কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং আমাদের নিজেদের কারখানা থেকে সংগৃহীত পরিমাপযোগ্য তথ্য। এই ধারা আরও জোরালো হবে বলেই ইঙ্গিত মিলছে। লাইটকাস্ট পার্টনার্সের গবেষণায় প্রতি ১০ জন কারখানা মালিকের মধ্যে আটজন জানিয়েছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে তারা অটোমেশনে বিনিয়োগ করবেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং সরকারের এটুআই কর্মসূচির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৩ লাখ ৮০ হাজার পর্যন্ত পোশাক শ্রমিক কর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকটের দ্বিতীয় স্তরটি কারখানার বাইরে, শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ের বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ। তরুণ নারী স্নাতকদের ক্ষেত্রে এই হার ১৬.৮ শতাংশ আর পুরুষদের ক্ষেত্রে ১১.২ শতাংশ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব বলছে, উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের মুখে রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের স্নাতকরা প্রবেশ পর্যায়ের যেসব পদের জন্য অপেক্ষা করেন, যেমন তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, হিসাব সংরক্ষণ কিংবা গ্রাহকসেবা, সফটওয়্যার এখন ঠিক সেই কাজগুলোই দ্রুত ও কম খরচে সম্পন্ন করছে। জমি বিক্রি করে, সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ নিয়ে সন্তানের উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা পরিবারের সংখ্যা আমাদের সমাজে কম নয়। সেই সন্তান স্নাতক শেষ করেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসেন, শত শত আবেদন পাঠান; অথচ বছরের পর বছর কোনো সাড়া পান না। দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব কখনোই কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে থাকে না, তা ক্রমে সামাজিক অসন্তোষে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চেহারা ধারণ করে। ২০২৪ সালে আমরা এর একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। শ্রমবাজার যখন একটি প্রজন্মকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, সেই প্রজন্ম নিষ্ক্রিয় থাকে না।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক অর্থনীতির গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ঘনবসতিপূর্ণ নগরকেন্দ্রে কাঠামোগত বেকারত্ব সামাজিক অস্থিরতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্বশর্তগুলোর একটি। কারণ সেখানেই প্রত্যাশা সর্বোচ্চ, তুলনা সবচেয়ে তীব্র এবং ক্ষোভ সবচেয়ে দ্রুত সংগঠিত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ঠিক এই বৈশিষ্ট্যেরই নগরকেন্দ্র। পোশাক কারখানা কেবল মজুরির উৎসই নয়; তা লাখ লাখ নারীর জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, পারিবারিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক মর্যাদার ভিত্তি রচনা করেছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অটোমেশনের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন নারী শ্রমিক, বয়স্ক শ্রমিক এবং তুলনামূলকভাবে কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। অর্থাৎ যারা এই খাতকে গড়ে তুলেছেন, তারাই সবচেয়ে অরক্ষিত। এই বাস্তবতায় করণীয় কী? প্রথমত, পুনঃপ্রশিক্ষণকে সেøাগানের পর্যায় থেকে জাতীয় নীতির স্তরে নিয়ে আসতে হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৫ সালের ফিউচার অব জবস প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বিশে^র ৪১ শতাংশ নিয়োগকর্তা ২০৩০ সালের মধ্যে জনবল হ্রাসের পরিকল্পনা করছেন। হাতে সময় খুব বেশি নেই। দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আন্তর্জাতিক শাসনকাঠামো নির্ধারণের আলোচনায় বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ওইসিডি, জি-৭সহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান এখন সেই নিয়মাবলি প্রণয়ন করছে, যা বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নির্ধারণ করবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সেই আলোচনায় অনুপস্থিত থাকলে নিয়মগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশগুলোর স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। বাণিজ্য আলোচনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কখনোই নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় না। তৃতীয়ত, স্মার্ট বাংলাদেশ কর্মসূচিকে কর্মসংস্থানের প্রশ্নে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন ।

কিন্তু মনে রাখা দরকার, উত্তরসূরি যদি কেবল প্রযুক্তি গ্রহণের সাফল্য উদযাপন করে এবং কারা এই রূপান্তরে পিছিয়ে পড়ছে সেই হিসাব প্রকাশ না করে, তাহলে প্রযুক্তির অগ্রগতি বৈষম্য কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে তুলবে। প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির নয়, প্রস্তুতির। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বাংলাদেশের অনুমতির অপেক্ষায় থাকবে না; এটি ইতিমধ্যে আমাদের কারখানা, দপ্তর ও শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে। রাষ্ট্র যদি এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে এই পরিবর্তন আমাদের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

লেখক : গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ফেলিসিয়ানো স্কুল অব বিজনেস মন্টক্লেয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত