অপশক্তির শেকড় সন্ধান জরুরি

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

হঠাৎ করেই দেশে বেড়ে গেছে বিস্ফোরক পাওয়ার খবর ও গুজব। ১১ আগস্ট ২০২৬ রাতে ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় একটি ভবনে অভিযান চালায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। অভিযানে আরিফ হোসেন (২৫) নামের এক সন্দেহভাজন জেএমবি সদস্যকে আটক করা হয় এবং ১৪টি শক্তিশালী পাইপবোমা ও বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। নব্য জেএমবির সদস্য আটকের ঘটনায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সিটিটিসির দল অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে আরিফকে গ্রেপ্তার করলেও বাকি আসামিরা কৌশলে পালিয়ে যান। পরে আরিফের দেওয়া তথ্যে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে ৯৮ শতাংশ ঘনমাত্রার সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, পটাশিয়াম নাইট্রেট পাউডার, আইইডি বোমা তৈরির ডেটোনেটর, রিমোট কন্ট্রোলার, ভোল্টমিটার ও জিপার ভর্তি বিয়ারিং বলসহ প্রায় আড়াই ডজন আলামত জব্দ করা হয়। পাশাপাশি, বাসাবাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ১০টি তৈরি তাজা পাইপবোমা জননিরাপত্তার স্বার্থে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করে।

এর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নেও বিস্ফোরক বস্তু উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার সাধাপুর এলাকার গোপেরবাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের সামনে একটি মাঠে পড়ে থাকা একটি প্রেশার কুকারের ভেতর থেকে বোমাসদৃশ একটি বস্তু উদ্ধার করা হয়। ২৫ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকানো অবস্থায় একটি পাইপবোমা (আইইডি) উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টোরথের শোভাযাত্রাকে লক্ষ্য করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও বড় ধরনের নাশকতার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিস্ফোরকটি সেখানে রাখা হয়েছিল। ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হওয়া উল্টোরথের শোভাযাত্রা মতিঝিলের শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমে যাওয়ার কথা ছিল। শোভাযাত্রা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে দায়িত্বরত আনসার প্লাটুন কমান্ডার (এপিসি) মো. রোকনুজ্জামান জেনারেটর কক্ষের পাশে রাখা একটি ছাতার ভেতরে বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পান। তিনি স্টেশন কন্ট্রোলারকে জানান, ছাতার ভেতর থেকে মিটমিট করে আলো জ্বলছিল। আনসার সদস্যদের সতর্কতায় ডিভাইসটি আগেই শনাক্ত হওয়ায় সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে। ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সার্কিটের সঙ্গে ছাতার বোতাম সংযুক্ত করা ছিল। কেউ ছাতাটি খোলার জন্য বোতাম চাপলেই ডিভাইসটি বিস্ফোরিত হতো। এর বাইরে মেট্রোস্টেশনে ব্যাগে বিস্ফোরক পাওয়ার গুজবে ব্যাহত হয় মেট্রো চলাচল। মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনের দ্বিতীয় তলায় একটি সন্দেহজনক ব্যাগ দেখতে পান কয়েকজন। একই সময়ে ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচতলায় একটি পিলারের পাশে আরেকটি সন্দেহজনক বস্তা পড়ে থাকতে দেখা যায়। ১ আগস্ট দুপুরে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনে পড়ে থাকা সন্দেহজনক ব্যাগটির প্রথমে ব্যাগটি এক্স-রে করা হয়। ভেতরে কৌটার মতো একটি বস্তু দেখা যায়। পরে ব্যাগটি নিরাপদে খোলা হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায়, ব্যাগের ভেতরে ছিল জর্দার একটি কৌটা ও পান। ১৭ আগস্ট দুপুরে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘সরাইল রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অন্যান্য চোরাচালান পণ্য জব্দের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরকও উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চারটি পিস্তল, ছয়টি এয়ারগান, পাঁচটি পাইপগান ও একটি ওয়ান শুটার গান। এ ছাড়া ৪০ রাউন্ড কার্তুজ, ১৮ দশমিক ৩৩ কেজি উচ্চবিস্ফোরক, ১১৭টি ডেটোনেটর এবং ৩০ মিটার ডেটোনেটর তার উদ্ধার করা হয়। রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়ায় একটি বাড়ি থেকে বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল দল। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছে বেশ কিছু বিস্ফোরকও পাওয়া গেছে। তিনি কথিত বোমারু মামুনের সহযোগী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে নানা ধরনের সহিংসতা চরমে পৌঁছেছিল। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একসঙ্গে প্রায় ৫০০টি সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। জেএমবি, হরকাতুল জিহাদের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি ও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে এ ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করত বলে অনেকের ধারণা। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ককটেল বা হাতবোমার ব্যবহার ছিল নিয়মিত ঘটনা। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্দোলন, হরতাল বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে দমাতে বিস্ফোরক মজুদ ও ব্যবহারের প্রবণতা একসময় আতঙ্কজনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আফগান যুদ্ধফেরত কিছু ব্যক্তির দেশে ফিরে এসে গোপন সশস্ত্র দল গঠন এবং তাদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে উগ্রবাদী আদর্শ ছড়িয়ে পড়ার কারণেও বিস্ফোরকের বিস্তার ঘটে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন ও নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার উগ্র বাসনা কিছু রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের ধর্ম নিরপেক্ষ ও উদার গণতান্ত্রিক প্রমাণে সচেষ্ট ছিল। জঙ্গিবিরোধী ও ইসলামপন্থি ক্ষমতার উত্থানের বিপক্ষে থাকা অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের সামনে একটি মহল প্রমাণ করতে চাইত যে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে। তাই একটি সুনির্দিষ্ট দলের বাইরে কেউ ক্ষমতায় এলে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে। এই মহলটি কৌশলে নিজেরাই অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরকের মজুদ ঘটিয়ে তা উদ্ধারের নাটক মঞ্চস্থ করত এবং এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশে সমীহ আদায়ে সচেষ্ট থাকত বলে দাবি করেন ইসলামী ধারার শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলো।

পতিত রাজনৈতিক সরকারের সময় জঙ্গি তকমা দিয়ে ইসলামিক দলগুলোর কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নানা প্রকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর কোণঠাসা হয়ে থাকা সব ইসলামিক দলের পক্ষে প্রকাশ্যে রাজনীতির ক্ষেত্রে সব বাধা দূর হয়ে যায়। তারা উন্মুক্ত প্রচারণা-প্রচারণা ও রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার মধ্য দিয়ে পূর্ণশক্তি নিয়ে ১৩তম জাতীয় নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করে এবং নির্বাচনের ফল আপাত দৃষ্টিতে মেনে নেয়। পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বড় ধরনের জঙ্গি তৎপরতার খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ নতুন সরকার গঠনের ছয় মাস না পেরুতেই বিস্ফোরক ও অবৈধ অস্ত্রের অস্তিত্ব তথা জঙ্গি তৎপরতার খবর নানা প্রকার প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজার হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়ায় জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে। তাদের কেউ কেউ আবার নতুন করে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে লিপ্ত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আবার সরকারকে চাপিয়ে ফেলতে দেশ ও দেশের বাইরের সরকার বিরোধী পক্ষ জঙ্গী তৎপরতা ও বিস্ফোরকের ব্যবহার নতুন করে শুরু করেছে বলে অনেকের ধারণা। বিশেষত বিগত সরকারের প্রধানসহ সেই সরকার ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একটা বড় অংশ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে মর্মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকেই বর্তমান বিস্ফোরক উদ্ধার ও একটি গোষ্ঠীর অপতৎপরতার পেছনে পূর্ববর্তী সরকারের ইন্ধন খোঁজার চেষ্টা করছেন। আবার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আসন্ন বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ বন্ধ করার একটি মোক্ষম হাতিয়ার হলো দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা এবং অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক মজুদ, ব্যবহার বা উদ্ধার দেখানো এবং পরবর্তী সময় তা দেশ ও বিদেশের মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এখন এক সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন সফর আবার ভারতে সফরের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা কেবল আঞ্চলিক বা প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কই নয়, সার্বিকভাবে বৈদেশিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের যুবরাজের পক্ষ থেকে সেই দেশে ভ্রমণের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সৌদি আরবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি বড় নৌজোটের অংশ হতে চলেছে, যেখানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১৪টি দেশের নৌবাহিনী সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাব আল মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরনের সামরিক জোটে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ কি হুতি তথা তাদের পৃষ্ঠপোষক ইরান ও ইরানের মিত্র হিসেবে চীন ও রাশিয়ার বিরাগ ভাজন হলো কিনা, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বাংলাদেশকে এমন নৌজোট থেকে দূরে রাখতে তথা সরকারকে চাপে রাখতে নতুন করে কোনো শক্তি জঙ্গিবাদ ও বিস্ফোরকের ব্যবহার শুরু করতে পারে। সবদিক বিবেচনা করে সরকারকে এখন কার্যকরী প্রতিরোধ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

directoradmin 2007 @gmail. com 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত