কোটায় উত্তীর্ণদের কাগজপত্র যাচাই করা হবে

এ বছরের (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এমবিবিএস (মেডিকেল) ভর্তি পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী কোটায় প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের কাগজপত্র বা তথ্যাদি যাচাই-বাছাই করা হবে। এতে যদি কারও তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের প্রাথমিক নির্বাচন বাতিল করা হবে। এ যাচাই-বাছাই কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভর্তিসংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। তবে বাকিদের ভর্তিসহ মেডিকেল কলেজের অন্যান্য কার্যক্রম চালু থাকবে।

গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে পাঠানো পৃথক দুই বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এর আগে দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, কোটা বাতিলের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত থেকে যে রায় দেওয়া হয়েছিল, সেখানে মূল পরিবর্তন এনে মুক্তিযোদ্ধার কোটায় নাতি-নাতনির জায়গায় সন্তানের কথা বলা হয়েছে। ভর্তির জন্য নির্বাচিতদের মধ্যে ১৯৩ জনের মধ্যে খুবই কম হবে যাদের বয়স ৬৭-৬৮ বছর এবং যাদের সন্তান থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। সেখানে যদি কোনো ত্রুটি ধরা পড়ে তাহলে সেটা দেখা হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘মেডিকেল কলেজ ২০২৪-২৫ সালের এমবিবিএস ভর্তি কার্যক্রমে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিদ্যমান। এটি বিধি অনুসারে শুধু মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য হবে, তাদের নাতি-নাতনি বা অন্য কারও জন্য প্রযোজ্য হবে না।

এ কোটার অধীনে সংরক্ষিত ২৬৯টি আসনের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৯৩ জন প্রার্থী পাওয়া গেছে। অবশিষ্ট ৭৬টি আসন ইতিমধ্যেই মেধা তালিকা থেকে পূরণ করা হয়েছে।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘এ কোটায় প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ১৯৩ জনের পিতামাতার মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র, নিজের জন্মনিবন্ধন সনদসহ যাবতীয় প্রমাণাদি ও অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট নিয়ে আগামী ২৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখের মধ্যে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পুরাতন ভবনের দোতলায় অবস্থিত মেডিকেল এডুকেশন শাখায় উপস্থিত হয়ে যাচাই-বাছাই করাতে হবে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা অসত্য তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর ভর্তি বাতিল হবে এবং মেধা তালিকা থেকে সেই শূন্য আসন পূর্ণ করা হবে।

অনুরূপ এক বিজ্ঞপ্তি দেয় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (শিক্ষা) ও ভর্তি কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষার ফল রবিবার (১৯ জানুয়ারি) প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল প্রণীত ভর্তি নীতিমালার ৯ দশমিক ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তান এবং পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর কোটার আসনে নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে অনুমোদনক্রমে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৩ ও ২৬ জানুয়ারি পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর কোটায় নির্বাচিত প্রার্থী এবং ২৭ জানুয়ারি, ২৮ জানুয়ারি ও ২৯ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত আসনে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের কোটার সপক্ষে সনদ বা প্রমাণকসহ স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে (মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলায়) সকাল ১০টায় উপস্থিত হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।

এ ছাড়া এসব কোটায় প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের কোটাসংক্রান্ত দলিলাদি ২১ জানুয়ারির মধ্যে সফট কপি ইমেইলে (সবফরপধষবফঁ৩১৩@মসধরষ.পড়স) পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য দেওয়া তথ্য মিথ্যা বা ভুল প্রমাণিত হলে প্রাথমিক নির্বাচন বাতিল বলে গণ্য হবে বলেও জানায় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।

গত ১৭ জানুয়ারি ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। রবিবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রকাশ করা হয় এমবিবিএস পরীক্ষার ফল। এ বছর ভর্তি পরীক্ষায় ১৯৩ জন মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য কোটায় উত্তীর্ণ হন।

প্রকাশিত ফলকে ‘বৈষম্যমূলক’ দাবি করে গত রবিবার রাতেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের একদল শিক্ষার্থী। তারা ফল বাতিলের দাবিও তোলেন। পরে গতকাল সোমবার দুপুরে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে মুক্তিযোদ্ধাসহ সব ধরনের কোটা বাতিলের দাবিতে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা সোমবারের মধ্যে মেডিকেল কলেজের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার ফল পুনঃপ্রকাশের দাবি জানান। এ সময় মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও সংহতি প্রকাশ করতে দেখা যায়।

এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে কোটা ব্যবস্থা বহাল থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গতকাল দুপুরে সংগঠনটির দপ্তর সেলের সদস্য শাহাদাত হোসেন সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের ব্যর্থতার কথা জানানো হয়।

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার। গতকালের শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি মেডিকেলে অযৌক্তিক বৈষম্যমূলক কোটা চালু রয়েছে। অনেকে ৭২ নম্বর পেয়েও চান্স পায়নি, অথচ অনেকে ৪০ পেয়েও চান্স পেয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পোষ্য কোটাসহ অযৌক্তিক কিছু কোটা রয়ে গিয়েছে। আমরা চাই অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফল পুনঃপ্রকাশ করা হয়।

সমাবেশে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আবির হোসেন বলেন, এই বছর মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনি কোটায় কাট মার্কের চেয়ে ৩০ থেকে ৩৫ নম্বর কম পেয়েও সরকারি মেডিকেলে চান্স পেয়েছে, যা আমরা মেনে নিতে পারি না আর মানবও না। আমরা মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ সব ধরনের কোটার বিলুপ্তি চাই।