‘আল্লাহর কসম! হে মক্কা, তুমি কতই না উত্তম ভূমি! যদি আমাকে তোমার থেকে বের করা না হতো তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে কখনো যেতাম না!’ প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার মুহূর্তে নবী করিম (সা.) এ উক্তিটি করেছিলেন। জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়ার কী যে নিদারুণ কষ্ট, সেটার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে নবী করিম (সা.)-এর এই সরল উক্তি থেকে।
মায়ের সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক যেমন মাতৃভূমির সঙ্গে আত্মার সম্পর্কও তেমন। কখনো দূরে গেলে বা আড়াল হলে মায়ের সান্নিধ্যের কোমল পরশ পেতে হৃদয় যেমন আনচান করে, তেমন জন্মভূমির ছোঁয়া পেতেও হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। জন্মভূমির প্রতি মানুষের এই টান সৃষ্টিগত। জীবনের কত শত স্মৃতি জড়িয়ে থাকে এই ভূমিকে কেন্দ্র করে, তা কি কখনো ভোলা যায়? যেখানে বেড়ে ওঠা, জীবনের গতিপ্রবাহ, যেখানে পড়ালেখার নিকেতন, খেলার মাঠ, জীবিকার ক্ষেত্র সব একাকার হয়ে থাকে, তাকে কি কখনো ছাড়া যায়? যেখানে দ্বীনধর্মের মারকাজ, ইবাদতের নিরাপদ পরিবেশ বিরাজমান থাকে, তা কি কারও কাছে তুলে দেওয়া যায়? স্বাধীনসত্তা বিকিয়ে দিয়ে পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হওয়া যায়? অবশ্যই না। সেটা কাপুরুষতার লক্ষণ। আদর্শের বিসর্জন। ইমানি চেতনা বিলুপ্তির আলামত।
জীবন দিয়ে রক্ষা করতে হবে স্বদেশের মাটিকে। নিরাপদ রাখতে হবে মাতৃভূমিকে। যেকোনো অপশক্তির রক্তচক্ষু ও আগ্রাসনকে রুখে দিতে হবে সমস্ত শক্তি দিয়ে। জানমাল, ইজ্জত-আব্রু হেফাজত করা আবশ্যিক কাজ। মা-বোনের ইজ্জত রক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য সংগ্রাম করা ইমানের দাবি। স্ত্রী-সন্তানের আবাসস্থল নিরাপদ রাখা অবশ্যই একজন মুসলিমের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ইসলাম সে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ, জীবন বা সম্মান রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে এবং তাতে নিহত হয়, সে শহীদ।’ (সহিহ বুখারি ২৪৮০)
দেশকে নিরাপদ রাখার জন্য যত ধরনের পদক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে তার সবই নেওয়া একজন রাষ্ট্রপ্রধানের কর্তব্য। স্বদেশে থেকে কেউ যদি বিদ্রোহ করে বা কোনো চক্রান্তে লিপ্ত হয় তাহলে অবশ্যই সেসব লোকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) মদিনা রাষ্ট্রকে মক্কার কাফের-মুশরিকদের আক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য পরিখা খনন করেছিলেন। পরিবেশ শান্ত রাখার জন্য বনি নজির, বনি কুরাইজার মতো কয়েকটি বিশৃঙ্খল জাতিকে মদিনা রাষ্ট্র থেকে বের করে দিয়েছিলেন। শিল্পপতি আবু রাফে, কবি কাব বিন আশরাফের মতো যারা মদিনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তথ্যসন্ত্রাস চালাত বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করত, আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে গালিগালাজ করত, তাদের তিনি কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন।
বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ। প্রতিদিন পাঁচবার এর আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয় ‘আল্লাহু আকবার’-এর মধুর ধ্বনিতে। কোটি মুসলিম ধুলোয় পড়ে মিনতি জানায় দয়াময় আল্লাহর দরবারে। এ দেশের মাটির পরতে পরতে শুয়ে আছেন শত শত পীর-আউলিয়া। সারা দেশে ছড়িয়ে আছে দ্বীনের বাতিঘরতুল্য লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসা। আছে খানকাহ, মাজার। আছে মুসলিম মনীষীদের নানা স্মৃতিবিজড়িত স্থান। সেই ভূমিকে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও শত্রুমুক্ত রাখার জন্য একজন মুমিনকে সবসময় তৎপর থাকতে হবে। মাতৃভূমি সুরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে। নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী শ্রম, মেধা ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে হবে। প্রয়োজনে জীবন বিলাতে প্রস্তুত থাকতে হবে। শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। ধর্মের অবমাননা হয় এমন যেকোনো সামাজিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতি আগ্রাসন রুখে দিতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।