দুটি অ্যাপার্টমেন্ট ও একটি দোকানের ভাড়ার টাকায় চলছে না প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশার ছেলে এরিক এরশাদের। এতে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে কষ্ট হচ্ছে তার। এ জন্য তিনি বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ রক্ষার্থে গঠিত ট্রাস্টের হিসাব বুঝে নিতে ও ট্রাস্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে চিঠি লিখেছেন।
এরিক এরশাদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা জানিয়েছেন, ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এরশাদপুত্র এরিকের খরচ বাবদ প্রতি মাসে বনানীর কুয়েত মৈত্রী মার্কেটে একটি দোকান, গুলশান ও বনানীতে দুটি ফ্ল্যাট থেকে প্রাপ্ত ভাড়া প্রায় তিন লাখ বিশ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু বিদিশা সিদ্দিক এরিক এরশাদের ভরণ-পোষণের অসিলা দিয়ে আরও মোট অঙ্কের অর্থ ও পুরো সম্পত্তি দখল করতে চান। এ জন্য তিনি এরিক এরশাদকে জিম্মি করে রেখেছেন।
এর ফলে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সম্পদের ভাগ নিয়ে আবার মুখোমুখি অবস্থানে এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক, তাদের সন্তান এরিক এরশাদ ও এরশাদ ট্রাস্ট।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে এরিকের চিঠি : গত মঙ্গলবার ট্রাস্ট সংক্রান্ত অনিয়ম নিরসনে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ চেয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছেন এরশাদপুত্র শাহাতা জারাব এরিক এরশাদ। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমার ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের নিরাপত্তার জন্য আমার বাবা ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট’ গঠন করেন, যার একমাত্র সুবিধাভোগী আমি। বর্তমানে ট্রাস্টের নির্ভরযোগ্য আয়ের অভাবে আমি কেবল মাত্র দুটি অ্যাপার্টমেন্ট ও একটি দোকানের ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল, যা আমার দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে আমাকে নিয়মিতভাবে আমার মায়ের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিতে হচ্ছে। অথচ কাজী মামুন এবং ট্রাস্টের অন্য সদস্যরা আমার মায়ের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্য ছড়িয়ে আমার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন এবং আমার মায়ের কাছ থেকে আমাকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন।’
এরিক তার চিঠিতে আরও বলেন, ‘এমতাবস্থায় আমার দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা এবং চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যদি আমার শারীরিক বা মানসিক কোনো ক্ষতি হয়, তার সম্পূর্ণ দায়ভার কাজী মামুন ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট সদস্যদের ওপর বর্তাবে। আমি একাধিকবার কাজী মামুন এবং ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা সবসময় সময়ক্ষেপণ ও টালবাহানা করছেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ট্রাস্টের হিসাব বুঝিয়ে দিচ্ছেন না।’
চিঠির শেষে এরিক বলেন, ‘ট্রাস্টের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং আমার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় কাজী মামুনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ট্রাস্টের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান এবং ট্রাস্টের ব্যাংক হিসাব স্বাভাবিক করার জন্য আপনার সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
চিঠিতে এরিক এরশাদ বলেন, ‘গত ১০ জানুয়ারি অবগত হই যে, ট্রাস্টের অবৈধ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগে আমার নিরাপত্তা এবং ট্রাস্টের নীতিমালা রক্ষার্থে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের জন্য একটি আবেদন দাখিল করেছেন। আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানাতে চাই যে, আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কোনো ঝুঁকির মধ্যে নেই। ইতিমধ্যে আমি পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে পত্রের মাধ্যমে ট্রাস্টের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মামুন ও বর্তমান অবৈধ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ট্রাস্ট সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছি।’
চিঠিতে এরিক আরও বলেন, ‘ট্রাস্টের মেয়াদ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। ট্রাস্টের একমাত্র সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও গত দুই বছর ধরে আমি ট্রাস্টের ব্যাংক হিসাব থেকে কোনো অর্থ উত্তোলন করতে পারিনি। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কাজী মামুন ট্রাস্টের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সম্পদের সঠিক তথ্য প্রদান করেননি। এছাড়াও তিনি সাম্প্রতিককালে ধর্ষণসহ বিভিন্ন মামলায় আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন।’
ট্রাস্ট দুষল বিদিশাকে : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রেখে যাওয়া সম্পদ বিদিশার বিরুদ্ধে বেদখলের অভিযোগ করেছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট। গতকাল বুধবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাস্ট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন ট্রাস্টের সদস্য কাজী মো. মামুনুর রশিদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর ও সদস্য খন্দকার মনিরুজ্জামান টিটু।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জীবিত থাকা অবস্থায় এরশাদ ও তার গঠিত অধিভুক্ত ট্রাস্ট সম্পদে সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিককে কোনো অধিকার দেয়নি। তবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর আইনি জটিলতার কারণে ট্রাস্টি বোর্ড কব্জায় নিতে না পারলেও এর অধিকাংশ সম্পদ বর্তমানে দখলে রেখেছেন বিদিশা সিদ্দিক। তিনি এরিক এরশাদের ভরণ-পোষণের অসিলা দিয়ে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করে আসছেন। তিনি এরিক এরশাদকে জিম্মি করে রেখেছেন।
মামুনুর রশিদ বলেন, ‘এরশাদের মৃত্যুর ৪ মাস পরই পুত্র এরিককে খাওয়ানোর কথা বলে বারিধারা প্রেসিডেন্ট পার্কে ঢোকেন বিদিশা সিদ্দিক। ট্রাস্টের অসিয়ত না মেনে এখনো এই ভবন দখল করে রেখেছেন। প্রেসিডেন্ট পার্কের পুরনো সব কর্মচারীকে বিদায় করেছেন।
ট্রাস্টের অধীনে এরশাদের সম্পদের হিসাব দিয়েছেন মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘বারিধারা প্রেসিডেন্ট পার্কের ৭ হাজার ৪২ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ও পার্কিং, গুলশানের ৯৬ নম্বর সড়কের ৪/বি বাড়ির ২ হাজার ৭১ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, বনানীতে আল নাহিয়ান ট্রাস্টের সংযুক্ত আরব আমিরাত মৈত্রী শপিং কমপ্লেক্সের এক হাজার ৬০ বর্গফুটের দোকান, রংপুরের ‘পল্লীনিবাস’, রংপুরের মিঠাপুকুরের ‘পল্লীবন্ধু কোল্ড স্টোরেজ, ১৫ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থায়ী ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়, শেয়ার এবং পাঁচটি গাড়ি ট্রাস্টে দান করেন এরশাদ। বাকি সম্পদ স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং বড় ছেলে রাহগীর আল মাহী এরশাদ শাদকে দিয়ে গেছেন সাবেক এ রাষ্ট্রপতি।’
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার নিজের নামে একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া মৃত্যুর আগে তার সম্পত্তিও উইল করে যান।