মামলার হয়রানি হয়রানির মামলা

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান আমলে শুরু হয়েছে মামলা করার প্রতিযোগিতা। এসব মামলায় কিছু লোকের নাম উল্লেখ করা হলেও সঙ্গে শত শত অজ্ঞাত লোকের নামের জায়গা খালি রাখা আছে। এ বিষয়ে দেশের মানুষের অতীত অভিজ্ঞতা খুব ভালো না। তারা জানে, এসব খালি জায়গায় কখন কার নাম বসে যাবে তা কেউ অনুমানও করতে পারবে না। ক্ষমতার বলয়ের মানুষদের যখনই যার নাম মনে হবে, তখনই সামান্য কারণে যেকোনো মামলার সে নামটি তারা যুক্ত করে দেবেন। দেশের সাধারণ কোনো পরিবারের কোনো সদস্যের নাম যদি তালিকায় থাকে তবে পরিবারের অপর সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্যরে মধ্যে যতটা যুদ্ধ করা সম্ভব তা করে একটা সময়ে দুহাত তুলে ঈশ্বরের কাছে নিজেদের ভাগ্যকে ছেড়ে দেয়।

বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ জনগণ বুঝতে পারছে না কে, কখন, কার নামে মামলা করছে। আজকের প্রধান উপদেষ্টাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদ্মা নদীতে ডুবাতে চেয়েছিলেন, এ জন্য চট্টগ্রামের একজন মানহানি মামলা করেছেন। দেশের মানুষ অতীতে এমন বহু ঘটনার সাক্ষী। এখানে তো মাত্র একটা মামলা হয়েছে। কিন্তু অতীতে এমন শত শত মামলা হতো এবং অনুসারীরা নেতার মান রক্ষায় ব্রতী হয়ে গ্রাম থেকে রাজধানী পর্ষন্ত লম্ফঝম্ফ শুরু করে দেশ গরম করে ফেলত। এসব মামলায় অনেকের জীবন নষ্ট হয়েছে, অনেকের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সহস্রাধিক মানুষকে জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে। কিন্তু তাই বলে প্রতিদিন হাজার হাজার হত্যা মামলা? হত্যা মামলার চাইতে দেশ ও জাতির স্বার্থের নামে যারা অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তির আইনি ব্যবস্থা জরুরি নয় কি? স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের মানুষ দেখছে মুড়ি মুড়কির মতো খুন, হত্যা, জখম আর তা শুধু ক্ষমতা আর সম্পদের জন্য। অর্থনীতি নিয়েও কম খেলা দেখিনি আমরা। ব্যাংক জালিয়াতি, শেয়ারবাজার ধস, ব্যাংকের খেয়ালি সংস্কৃতি, দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার, কমিশন বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মেগা প্রকল্প, ঠিকাদারি, সিন্ডিকেট ব্যবসা ইত্যাদির যে রমরমা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রথমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। যারা সন্তান হারিয়েছে, যারা অভিভাবক হারিয়েছেন তাদের প্রতি দেশবাসীর সমবেদনার কোনো কমতি আছে, তা মনে করারও কোনো কারণ নেই। হত্যা মামলায় যে শত শত অজ্ঞাত ব্যক্তির নাম ফাঁকা রাখা হচ্ছে তা যেন কোনোভাবে সাধারণ মানুষের জন্য ফাঁদ না হয়ে দাঁড়ায়, সে বিষয়টা লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। জনগণের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

দেশের দুর্নীতির সাম্প্রতিক প্রকৃষ্ট উদাহরণ মেট্রোরেলের মিরপুর স্টেশনের মেরামত। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ব্যাপক ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শনে গেলে জানানো হয়েছিল, মেরামতের জন্য এক বছর সময় ও ৩০০ কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে। কিন্তু এরপর দেশের মানুষ দেখল, অনেক কম টাকায় মেরামত শেষ করে চালু হয়ে গেল স্টেশনটি। অতীতে এভাবেই একটার পর একটা উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বপ্ন জনগণের চোখের সামনে বাস্তবায়িত হয়েছে। জনগণ দেখেছে ৫ হাজার টাকায় বালিশ কিনতে, ৩৭ হাজার টাকায় পর্দা কিনতে, ১.৭৫ লাখ টাকায় কাঠের চেয়ার কিনতে, ৬২ লাখ টাকায় নারকেলগাছ কিনতে, ৬ লাখ টাকায় কলাগাছ কিনতে, ৯১ হাজার টাকায় হাতুড়ি কিনতে, ৪৬ হাজার টাকায় পাইপ কাটার কিনতে, ১৫.০৯ লাখ টাকায় প্রিন্টার কিনতে। আরও দেখেছে সাড়ে ৫ লাখ টাকার সাইনবোর্ড, ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার সিল বানাতে। এক দল উগান্ডার পয়ঃনিষ্কাশন দেখতে গিয়েছে, ফলে  অন্যরা তো বসে থাকতে পারে না। তাই তারা দল ধরে ছুটেছে পুকুর খনন শিখতে, খিচুড়ি রান্না শিখতে, ট্যাগবোট চালানো শিখতে, ভূমি জরিপ শিখতে, ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট পালন শিখতে। এখানেই শেষ নয়, দেশের এমন প্রকল্প পাওয়া যাবে না, যা নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ে শেষ করা হয়েছে। স্ব-অর্থায়নের পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয় ঘোষিত প্রাথমিক ব্যয়ের তিনগুণ, ফলে অন্য প্রকল্পের অবস্থা অনুমান করতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

মেগা প্রকল্প সবচাইতে লাভজনক হওয়ায় এ প্রকল্পগুলোকেই টাকা পাচারের হাতিয়ার করা হয়েছিল। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ৪০ হাজার কোটি টাকার ঢাকা থেকে যশোর হয়ে পায়রা বন্দর রেলপথ, মেট্রোরেল প্রকল্প, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট, ৪ হাজার কোটি টাকার স্যাটেলাইট, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, পায়রা বন্দর ইত্যাদির সঙ্গে পরিকল্পনায় আরও ছিল ঢাকা-কক্সবাজার বুলেট ট্রেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, পূর্বাচলে ১১০ তলা বঙ্গবন্ধু বহুতল ভবন, শরীয়তপুরে ও নোয়াখালীতে বিমানবন্দর, দ্বিতীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ আরও কত শত মেগা প্রকল্প। দেশের এমন উন্নয়ন ও অগ্রগতির ফলে আমাদের মাথাপিছু দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ টাকার ওপর। সরকারি সংস্থা কর্র্তৃক প্রকাশিত খবরে বছরে ৭০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের দাবি দায়িত্ববানরা আমলেই নেয়নি। ৪ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক জালিয়াতির খবর প্রকাশের পরও দেশবাসীকে শুনতে হয়েছে দেশের জন্য এ টাকা কিছুই না।

ব্যাংকের টাকা নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে, বিদেশে টাকা পাচারের সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে, ডাকাতি করে অভিজাত জীবন নিশ্চিত করার খবর জনগণের জন্য হয়েছে খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ জনগণ এদের বিচার আগে চায়। তারা প্রত্যাশা করে, নামের তালিকা ফাঁকা রেখে নয়, সুনির্দিষ্ট মামলা করা হোক এবং যারা দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, বিচারের আওতায় এনে তাদের দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাবেক সভাপতি ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)

khairulumam1950@gmail.com