কারণ খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ মা জানেন না খুনের কথা

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর শিক্ষার্থী অর্ণব কুমার সরকারকে (২৮) গুলি করে হত্যার ঘটনায় এখনো কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। পরিবারের পক্ষ থেকেও কাউকে সন্দেহ করা হচ্ছে না। তবে কয়েকটি দিক সামনে রেখে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এ ঘটনায় গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে রাতে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সোনাডাঙ্গা থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে শুক্রবার রাতেই তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কোনো কিছু নিশ্চিত হতে না পেরে আটক ওই তিনজনের নাম প্রকাশ করছে না পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, নারীঘটিত ইস্যু, বাবার ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কোনো গ্রুপের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে কি না, এই তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে।

গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে খুলনা নগরের তেঁতুলতলা মোড় এলাকায় অর্ণবকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাতে তেঁতুলতলা মোড়ে একটি চায়ের দোকানের সামনে মোটরসাইকেলে হেলান দিয়ে চা খাচ্ছিলেন অর্ণব। এ সময় ১০-১৫টি মোটরসাইকেলে লোকজন এসে প্রথমে তাকে গুলি করে। গুলি তার গায়ে লাগার পর রাস্তায় পড়ে গেলে সন্ত্রাসীরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে রেখে চলে যায়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পার্শ্ববর্তী খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অর্ণব খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের মাস্টার্সের ছাত্র।

গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছোপ ছোপ রক্ত পড়ে আছে। জায়গাটি ইট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। উৎসুক মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছেন।

অর্ণবদের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার রাজনগর গ্রামে।

তার বাবা নীতীশ চন্দ্র সরকার একজন ঠিকাদার। তারা ১৫ বছর ধরে খুলনা নগরের বানরগাতি ইসলাম কমিশনারের মোড় এলাকার করতোয়া লেনে বাড়ি করে বসবাস করছেন। ওই লেনের একেবারে শেষ বাড়িটি তাদের।

অর্ণবের লাশ গতকাল দুপুরে বাড়িতে পৌঁছায়। দুপুর ১২টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। লাশ বাড়িতে নিয়ে ঘণ্টাখানেক রেখে সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে ছেলের খুন হওয়ার কথা জানানো হয়নি অর্ণবের মাকে, তাকে বলা হয়েছে, অর্ণব মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তার আহাজারি থামছেই না।

সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, অর্ণবের শরীরে বেশ কয়েকটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি পিস্তলের গুলি ও একটি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অর্ণবের বাবা ঠিকাদার ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সেই ব্যবসা দেখাশোনা করতেন অর্ণব। এটা নিয়ে কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীঘটিত কোনো ঘটনা বা অন্য কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কি না, সে ব্যাপারগুলো তদন্তে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। অর্ণবের পিসি (ফুপু) রুপা সরকার বলেন, ‘অর্ণবের মাকে এখনো অর্ণবের খুন হওয়ার কথা জানানো হয়নি। তাকে বলা হয়েছে, অর্ণব মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে।’

অর্ণবের মা দীপিকা সরকার বারবার বিলাপ করতে করতে বলছেন, ‘বাবা তুই কেন মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলি!’ তিনি আরও বলেন, ‘বিকেল ৫টার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিল অর্ণব। কয়েকটি স্থানে ওর বাবার ঠিকাদারির কাজ চলছে। সেই কাজ দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ করে জানতে পারি, অর্ণব মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।’

অর্ণবরা দুই ভাই। বড় অর্ণব। ছোট ভাই অনিক কুমার সরকার এবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছেন। গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ছিল। কিন্তু বড় ভাই মারা যাওয়ায় তার আর পরীক্ষা দিতে যাওয়া হয়নি।

অর্ণবদের প্রতিবেশী মো. চুন্নু বলেন, অর্ণব খুবই ভদ্র ছেলে। এলাকায় কারও সঙ্গে তাকে কোনো খারাপ আচরণ করতে দেখা যায়নি। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার ব্যবসা দেখতেন। হঠাৎ অর্ণবের খুন হওয়ার খবর শুনে এলাকার সবাই হতবাক হয়েছেন।