টানা পাঁচ বছরের অচলাবস্থার পর ফের খুলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের দুয়ার। এ নিয়ে জোর প্রস্তুতি চলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে। এর মধ্যে সংস্কার প্রস্তাব জমা দিয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলো। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডাকসুর গঠনতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা। বিশেষ করে পদাধিকারবলে ডাকসু সভাপতির পদটি নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারণ করা।
বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, পদাধিকার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন। তার হাতে ডাকসু-সংক্রান্ত সবকিছু করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এমনকি সভাপতি চাইলে ডাকসুর যেকোনো সিদ্ধান্ত বাতিল এবং পুরো ডাকসুর কমিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করার ক্ষমতাও রাখেন। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতাদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা বিরাজ করছে। এ নিয়ম বদলে এই পদে সরাসরি শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত করার প্রস্তাব জানিয়েছে বেশিরভাগ ছাত্র সংগঠন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তাদের প্রস্তাবনাকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে উপাচার্যকে সভাপতি রেখে তার ক্ষমতার সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ঐতিহ্য রয়েছে বিশ্বের অনেক দেশে। বিশ্বের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ত এ পদে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্বখ্যাত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, ভারতের জওহার লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, শ্রীলঙ্কার জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধারা প্রচলিত রয়েছে।
বিভিন্ন সংগঠনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ডাকসুর কার্যক্রম পরিচালনায় উপাচার্যের কোনো কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকতে পারবে না। সব সিদ্ধান্ত নেওয়া ও কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা থাকবে ডাকসুর নির্বাচিত কমিটির সদস্যদের হাতে। ডাকসু নির্বাচনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্যালেন্ডার ইভেন্ট’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গঠনতন্ত্রে যুক্ত করা, প্রার্থীদের বয়সসীমা নতুনভাবে নির্ধারণ (বর্তমানে প্রার্থীদের সর্বোচ্চ বয়স ৩০ বছর রয়েছে) করে দেওয়া এবং বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলো।
ডাকসু নির্বাচনে সভাপতি পদে সরাসরি শিক্ষার্থীদের রাখার প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দুটি পদ তৈরি করে একটি ছাত্র ও একটি ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে বর্তমানে কোষাধ্যক্ষ পদে উপাচার্য ক্ষমতাবলে একজনকে নিয়োগ দেন। এ পদেও শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ চায় ছাত্রদল। নির্বাহী কমিটিতে নতুন পাঁচটি সম্পাদক পদ তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত এবং কার্যনির্বাহী কমিটির নিয়মিত নির্বাচন নিশ্চিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩-এ যথাযথ সংশোধন আনা একান্ত জরুরি বলে মনে করছে ছাত্রদল।
এ বিষয়ে ঢাবি ছাত্রদল সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ডাকসুকে কার্যকর করতে হলে গঠনতন্ত্রে সংস্কার দরকার। আর ঢাবির উপাচার্য নির্বাচিত প্রতিনিধি না হয়েও ডাকসুর অভিভাবক হওয়া স্বৈরতন্ত্রেরই প্রতিচ্ছবি। ডাকসু সভাপতির পদকে সরাসরি ভোটে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্বাচিত করতে হবে। ঢাবির প্রতিটি সিদ্ধান্তে ছাত্র প্রতিনিধির কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে।
এটিকে অসীম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা বলে উল্লেখ করে শিবির তাদের সংস্কার প্রস্তাবনায় বলে, যেহেতু সভাপতি পদটি একটি অনির্বাচিত পদ, সুতরাং এর হাত থেকে সব নির্বাহী ক্ষমতা বাতিল করতে হবে। নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে শুধু ডাকসুর কার্যকরী পরিষদের হাতে। সভাপতি পদটিকে শুধু একটি আলংকারিক পদ হিসেবে রাখতে চায় শিবির।
তারা বলছে, যেকোনো সময়ে ডাকসুর গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের যে ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটকে দেওয়া হয়েছে, সেটির পরিবর্তন করতে হবে এবং ডাকসু গঠনতন্ত্র সংশোধনের এখতিয়ার ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিতে হবে, নির্বাহী কমিটির সভায় যেকোনো অ্যাজেন্ডা আলোচনা করার জন্য সভাপতির অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করতে হবে, গঠনতন্ত্রের অনুল্লিখিত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সভাপতির একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সংসদের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য করতে হবে।
ঢাবি শিবির সভাপতি এসএম ফরহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভিসির নির্বাহী ক্ষমতা ছাত্র প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধাগ্রস্ত করে। এজন্য এর সংস্কারটা দরকার। একই সঙ্গে ভিসি কিংবা প্রভোস্টকে একদম বাদ দেওয়ার মাধ্যমেও সমন্বয়টা হয় না। সীমিত ক্ষমতার মধ্য দিয়ে যদি ভিসি কিংবা প্রভোস্ট এই পর্ষদে থাকে, তাহলে প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কলাবরেশনটা ভালোভাবে হয়। তাদের শিক্ষার্থীদের কথাগুলো সরাসরি শোনার সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে সীমিত করার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগটাও পাবেন না। এজন্য আমরা এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছি।
ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য ছাত্র ফেডারেশন ১৮টি প্রস্তাব দিয়েছে। এতে সভাপতি পদে নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দিতে প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বয়সের বাধা উঠিয়ে দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফেডারেশনের আহ্বায়ক আরমানুল হক বলেন, ‘নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের হাতেই আমরা সব ক্ষমতা দেখতে চাই।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, উপাচার্য ডাকসুর সভাপতি থাকা উচিত নয়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের থেকে সভাপতি নির্বাচিত হওয়া উচিত। উপাচার্য যদি থাকেনও, তার ক্ষমতা কমিয়ে আনা উচিত।’
ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটির সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সংস্কার প্রস্তাবনা পাওয়া গেছে। এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করে আমরা দ্রুততম সময়ে উপাচার্যের কাছে জমা দেব। গুরুত্বপূর্ণ সব প্রস্তাবনা এতে থাকবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুরুত্ব সহকারে দেখছে। আমরাও চাই সব ক্ষেত্রে ছাত্রদের প্রতিনিধি থাকুক। বর্তমানে পদাধিকার বলে উপাচার্য সভাপতি হিসেবে আছেন। যেহেতু প্রায় সবার প্রস্তাবনায় বিষয়টি আছে। আমরাও সেটা চিন্তা করছি। আলোচনার মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত করা হবে।’