বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলনে মিশে আছে ‘তিতুমীর’ নামক ফল্গুধারা। দ্রোহ ও সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক মির নিসার আলী তিতুমীরের জন্ম ১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি, ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে। পরিণত বয়সে একটা বিষয় তিতুমীরকে খুব বেশি ভাবায় এবং প্রচন্ডভাবে মর্মাহত করে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য তিতুমীর সদা চিন্তিত থাকতেন। তৎকালে ব্রিটিশদের আজ্ঞাবহ জমিদারদের দ্বারা বাংলার কৃষক সম্প্রদায় ছিলেন নিদারুণ শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। বাংলার কৃষকরা জমিদারদের অত্যাচারে নিঃশেষ হয়ে পড়েছিল। তিতুমীর এই অবস্থা দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হন। তিনি কৃষকদের মুক্তির জন্য সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিতুমীর একটি লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করে জমিদার, জোতদার-মহাজন এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন। তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্থানীয় জমিদারদের নিজস্ব বাহিনী এবং ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের হাতে উপর্যুপরি পর্যুদস্ত হতে থাকে। তিতুমীরের এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। টনক নড়ে ইংরেজ বেনিয়াদের।
এই আন্দোলন দ্রুত পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভয়ে ব্রিটিশ সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তিতুমীরকে দমন করার জন্য ইংরেজরা একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করে। তিতুমীরও স্থানীয় কৃষক এবং প্রজাদের নিয়ে একটি লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন। বিখ্যাত ‘দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমান’ বইয়ের লেখক উইলিয়াম হান্টার বলেন, ওই বিদ্রোহে প্রায় তিরাশি হাজার কৃষকসেনা তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধ করেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের এই বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে কীভাবে তিতুমীর স্বাধীনতার দীক্ষা দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য! ১৮৩১ সালে তিনি বারাসাতের ‘নারিকেলবাড়িয়া’য় একটি বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে সেখানে অস্ত্র জমা করেন। বাঁশ এবং কাদা দিয়ে তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীরা এই কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন। যা ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ১৯১৯ সালের খিলাফত আন্দোলন, ৪৭-এ দেশভাগ, ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি স্বাধিকার ও মুক্তিকামী আন্দোলনে প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ইংরেজ বাহিনী পুরো ‘নারিকেলবাড়িয়া’ ঘিরে ফেলে। সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে তিতুমীর তার অনুসারীদের অভয় দিয়ে বলেন, ‘মৃত্যুকে ভয় পেলে চলবে না, এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়; আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ দেশ স্বাধীন করবে’। ইংরেজদের কামানের গোলাবর্ষণে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা। তিতুমীর এবং তার প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুমসহ চল্লিশজন অনুসারী লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।
তিতুমীর ঠিকই বলেছিলেন। তার লড়াইয়ের পথ ধরেই এই হিমালয়ান উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধে। তিতুমীরের এই আন্দোলন এবং ত্যাগ বাঙালি জাতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। তিতুমীরের আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলন কেবল একটি স্থানীয় বিদ্রোহ ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালি জাতিকে একত্র করার এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি প্রাথমিক প্রচেষ্টা। তিতুমীর কৃষকদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতার চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। তিনি জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সামাজিক অসাম্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। যদিও তিতুমীরের আন্দোলন ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, তবে তিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে একত্র করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই ঐতিহাসিকরা স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বাঙালি জাতির জীবনে তিতুমীরের আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল ব্যাপক। তার এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম গণবিদ্রোহগুলোর মধ্যে ছিল অন্যতম। এটি পরে অন্যান্য বিদ্রোহের জন্য অনুপ্রেরণার সূত্র হিসেবে কাজ করেছিল। বাঙালি জাতির মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন তিতুমীর।
লেখক : শিক্ষার্থী
nawajcu9@gmail.com