বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার বাণিজ্যে সক্রিয় পুরনো চক্র

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা কূটকৌশলে বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটার বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি শক্তিশালী চক্র। নেপথ্যে ছিলেন সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং তৎকালীন বিদ্যুৎ সচিব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। নতুন করে এখন আবার ভিন্ন উপায়ে সেই চক্রটি সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ এবং এই খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, মূলত বিদ্যুতের অপচয় ও চুরি রোধ করে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে এসব প্রিপেইড মিটার বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এরই মধ্যে কয়েক লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এসব মিটার ক্রয়ে উপযুক্ত প্রতিযোগিতা যেমন ছিল না, তেমনি বেশি দামে নিম্নমানের মিটারও কেনা হয়েছে। গ্রাহকের স্বার্থ কতটুকু পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও একটি চক্র মিটার-বাণিজ্যের মাধ্যমে রাতারাতি যে ফুলেফেঁপে উঠেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকেই মিটার আমদানিকে ঢাল বানিয়ে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলেও রয়েছে অভিযোগ।

প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকের মধ্যেও ক্ষোভের শেষ নেই। অনেকেই বাড়তি বিল আদায়ের অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। ‘ভুতুড়ে’ বিলেরও রয়েছে অভিযোগ। এসব মিটার এখন যাচাই করে দেখা হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মিটার-বাণিজ্যের সঙ্গে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বিদ্যুৎ সচিব, সংস্থা ও কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালকরাও যুক্ত ছিলেন। তাদের কেউ আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন, আবার কেউ নিয়েছেন পদোন্নতির সুবিধা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান এসব মিটার গ্রাহকের আঙিনায় সরবরাহ করছে। বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলে ১৭টি মিটার উৎপাদন ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে বিপু সিন্ডিকেটের একচেটিয়া বাণিজ্যের কারণে অন্তত চারটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিটার প্রস্তুতকারী দেশীয় একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কিছু মিটার উন্মুক্ত দরপত্র এবং কিছু মিটার কেনা হয়েছে ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করে। উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতেই মিটার কেনার ক্ষেত্রে কোন ঠিকাদার কাজ পাবেন, তা সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী চূড়ান্ত করে দিতেন। দর কী হবে, কমিশন কত দিতে হবেÑ এর সবকিছুই ঠিক করে দিতেন তিনি এবং তার চক্রের হোতারা। এরপর সে অনুযায়ী পাতানো দরপত্র আহ্বান করা হতো। এ ক্ষেত্রে ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিত এবং নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে দেওয়া হতো দরপ্রস্তাব। বিপু সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কারও দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ, সাহস কোনোটাই ছিল না।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, অতীতে প্রিপেইড মিটার ক্রয় নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে প্রিপেইড মিটারে এডিবি (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) একপর্যায়ে অর্থায়নও বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন থেকে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সব ধরনের কেনাকাটা হবে। কে কার লোক, তা এখানে বিবেচনা করা হবে না।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া প্রিপেইড মিটারের প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আর কোনো চক্র তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

শক্তিশালী সিন্ডিকেটের পাতানো দরপত্র : এই সিন্ডিকেটে দেশীয় কিছু প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছিল চীনা প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানেরই পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও মিটার সরবরাহের কাজ পেয়েছে। এমনি এক প্রতিষ্ঠান ‘অকুলিন টেক’। ২০১৯ সালে চীনের সেনজেন স্টারের সঙ্গে যৌথভাবে নেসকোতে মিটার সরবরাহের ১০৭ কোটি টাকার কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ২০২১ সালে তারা আবার নেসকোতে পায় প্রায় ৯২ কোটি টাকার কাজ। সেই অভিজ্ঞতা সনদ দেখিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) মিটার সরবরাহের কাজ নেয় অকুলিন। এখানে আরও বড় বাণিজ্য করে তারা।

অভিজ্ঞতা ছাড়াই নেসকোতে কাজ দিতে নেসকোর বোর্ডকে চাপ প্রয়োগ করেন তৎকালীন বিদ্যুৎ সচিব আহমদ কায়কাউস। যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হয়ে পরে দায়িত্ব পান মুখ্য সচিবের।

বিগত সরকারের আমলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো যেসব মিটার কিনেছিলেন, তার কয়েকটি যাচাই করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দরপত্রেই অংশ নিয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আবার নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে দরপ্রস্তাব জমা দিত পাতানো দরপত্রে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৪ অক্টোবর আট লাখ মিটার কিনতে প্রথম দফায় যে দরপত্র জমা নেওয়া হয়, সেখানে সাতটি কোম্পানি অংশ নিয়েছে। এর আগ পর্যন্ত সাতটি দরপত্রের মাধ্যমে সাড়ে ১৪ লাখ মিটার সরবরাহের কাজ দিয়েছে নেসকো।

মিটার-বাণিজ্যের জন্য মূলত আরইবিকে টার্গেট করেছিল চক্রটি। তাদের গ্রাহকসংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি। এ পর্যন্ত ১৭ লাখ মিটার বসানোর পাশাপাশি ৫ লাখ ৬০ হাজারের কাজ চলছে। প্রকল্প করে মিটার কেনার কাজটি করে আরইবি, তারপর তা ভাগাভাগি করে বিভিন্ন সমিতিতে পাঠানো হয়। আবার সমিতির নামে দরপত্র দেয় আরইবি। ওই সমিতিকে তার অংশের বিল পরিশোধ করতে হয়। আরইবির বাড়তি দামে কেনাকাটা নিয়ে সমিতির কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ আছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নসরুল হামিদ বিপু ও আহমদ কায়কাউসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

ডিপিএম পদ্ধতিতে মিটার ক্রয় : পাতানো দরপত্রের পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলে ডিপিএম পদ্ধতিতেও বহু মিটার কেনা হয়েছে। মূলত জরুরি প্রয়োজনে সক্ষমতা থাকার শর্তে রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে এই প্রক্রিয়ায় মালামাল কেনার সুযোগ থাকলেও শক্তিশালী ওই চক্রটি নিজেদের স্বার্থে এটি ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে অনেক সময় উন্মুক্ত দরপত্রে কেনার সুযোগ থাকলেও তা না করে জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে মিটার কেনা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে একক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে দেওয়া হয়েছে কার্যাদেশ।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নসরুল হামিদের নির্দেশে আমলে মিটার উৎপাদন করে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি সরবরাহের জন্য রাষ্ট্রীয় এবং চীনা দুটি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বে দুটি নতুন কোম্পানি তৈরি করা হয়। এর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বেসিকো)। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ৫১ শতাংশ ও চীনের হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড ৪৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বেসিকোর নিবন্ধন নেয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) ৫১ শতাংশ শেয়ার ও চীনের সেনজেন স্টার ইনস্ট্রুমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ৪৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বাংলাদেশ পাওয়ার ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (বিপিইএমসি) নামে আরও একটি কোম্পানি তৈরি করা হয়। সেনজেন স্টারের স্থানীয় প্রতিনিধি নসরুল হামিদের আত্মীয় মাহবুব রহমান ওরফে তরুণ।

এই দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ছাড়াই বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানিতে মিটার সরবরাহ করছে ডিপিএম পদ্ধতিতে। এর মধ্যে বেসিকোর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

বেসিকোর মিটার সরবরাহ কার্যক্রম নিয়ে ২০২১ সালে ওজোপাডিকোর একটি নিরীক্ষায় দেখা যায়, নিজেরা তৈরির কথা থাকলেও আমদানি করে মিটার সরবরাহ করেছে তারা। আর আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তি দেখিয়ে ৩৬ কোটি টাকা পাচার করেছে বেসিকো। এরপর টাকা পাচারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে ২০২২ সালের জুলাইয়ে একটি চিঠি দেন ওজোপাডিকোর তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) রতন কুমার দেবনাথ।

ওই একই সময়ে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। এরপর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে মামলা তুলে নিতে ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে নির্দেশনা দেয় ওজোপাডিকোর বোর্ড। এখানেও নসরুল হামিদের হাত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর অক্টোবরে আবেদনের পর নভেম্বরে মামলাটি প্রত্যাহার হয়ে যায়। ওই সময় বোর্ড সভাপতি ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব নূরুল আলম। যিনি পরে জ্বালানি বিভাগের সচিব হন। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছে।

এখনো সক্রিয় পুরনো সিন্ডিকেট : আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুরনো সেই সিন্ডিকেটের মূল হোতারা গা-ঢাকা দিলেও তাদের হয়ে নতুন মুখ এখন এই বাণিজ্যে তৎপর বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। ডিপিএম প্রক্রিয়ায় টেন্ডার দেওয়ার জন্য জোর তদবির চালানো হচ্ছে। চক্রটি বিতরণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দরপত্র ছাড়াই মিটার সরবরাহের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে ইতিমধ্যে। এসব প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। একটি প্রতিষ্ঠান ডিপিএম পদ্ধতিতে মিটার ক্রয়ের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে অনেক মিটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা উন্মুক্ত দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার সরবরাহ করতে সক্ষম। যদি এই প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হয়, তবে সরকার কমমূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন স্মার্ট প্রিপেইড মিটার কিনতে পারবে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করবে। পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচারও বন্ধ হবে।