চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে ডাম্পিং অবস্থায় থাকা ২৯৭টি গাড়ির মধ্যে ২২ বছরের পুরনো গাড়িও রয়েছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এসব গাড়ির মধ্যে ১৯৫টি গাড়ি মামলার কারণে এত বছর বন্দরের ইয়ার্ডে পড়ে রয়েছে, খালাস হয়নি। এখনো খালাস বা নিলাম বা ধ্বংস হবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে খোদ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
গত ২৪ ডিসেম্বর নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রাম কাস্টমস পরিদর্শনে এসে পুরনো সব গাড়ি ৩১ জানুয়ারির মধ্যে নিলাম করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনার পর বন্দরের ইয়ার্ড থেকে পুরনো এসব গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু গাড়িগুলোর ইনভেন্টরি (তালিকা প্রণয়ন) এত বছর হয়নি। উপদেষ্টার আলটিমেটাম পাওয়ার পর গাড়িগুলোর বিষয়ে ডকুমেন্টাল খোঁজ নেওয়া শুরু করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। আর বন্দরের ইয়ার্ডে থাকা সব গাড়ির ডকুমেন্ট পরীক্ষা সম্প্রতি শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, ইয়ার্ডে পড়ে থাকা ২৯৭টি গাড়ির মধ্যে ১৯৫টি গাড়ির বিপরীতে মামলা রয়েছে। এ মামলার কারণেই এত বছর গাড়িগুলো খালাস করা যায়নি, কিংবা নিলামও করা যাচ্ছে না। বন্দরের পি শেডের ডাম্পিং ইয়ার্ডে পড়ে থাকা গাড়িগুলোর মধ্যে দামি মডেলের প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পাজেরো যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে বেশকিছু পিকআপ ও ট্রাক। এসব গাড়ির কোনোটি ২০০২ সাল থেকে মামলায় আটকা রয়েছে বলে কাস্টমস সূত্রে জানা যায়।
আটক থাকা বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের মুখপাত্র ও উপকমিশনার সাইদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলাযুক্ত কোনো গাড়ি নিলাম করা যাবে না। আমরা এত বছর গাড়িগুলোর ইনভেন্টরি করতে পারিনি। এখন ইনভেন্টরি করে জানা গেল গাড়িগুলো খালাস না হওয়ার পেছনের কারণ মামলা জটিলতা। তিনি বলেন, আদালতে বিচারাধীন কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই আইনের বাধ্যবাধকতা নেই বলে জানান কাস্টমস থেকে বিড করে পণ্য সংগ্রহকারীদের সংগঠন কাস্টমস বিডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি মামলার একটি নির্ধারিত সময় থাকে। একটি মামলা আজীবন চলতে পারে না। গাড়ির মামলাগুলো ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার কথা। আর যদি আদালত রায় নাও দেয় তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বাতিল হয়ে যায়। সেই আলোকে কাস্টমস তা নিলামে ওঠাতে পারে। কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তারা আইনের দোহাই দিয়ে গাড়িগুলো রেখে দিয়ে নষ্ট করে ফেলে। পরে আর এগুলো ব্যবহারও করা যায় না।’ তিনি আরও বলেন, কাস্টমস এত বছর পর কেন ইনভেন্টরি করতে গেল? আরও আগে কেন করেনি? সম্প্রতি উপদেষ্টা আলটিমেটাম দেওয়ার কারণে তাদের টনক নড়েছে।
এসব গাড়ি নিয়ে মামলা কেন হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা ও কাস্টমস নিলামে অংশ নেওয়া বিডাররা জানান, আমদানিকৃত গাড়ির সঙ্গে ডকুমেন্টের মিল না থাকা এবং যে সিসির গাড়ির আনার কথা ডকুমেন্টে উল্লেখ করা হয়েছে এর চেয়ে বেশি সিসির গাড়ি আনা। এ ছাড়া পাঁচ বছরের পুরনো গাড়ি (উৎপাদনের তারিখ থেকে বন্দরে আসার তারিখ পর্যন্ত) আনা হলে, কারনেট সুবিধায় (পর্যটক সুবিধায়) আসা গাড়িসহ বিভিন্ন কারণে কাস্টমস থেকে ক্লিয়ারেন্স না পাওয়া গাড়িগুলোতেই মামলা হয়েছে। আর এসব গাড়ির বেশিরভাগই চট্টগ্রাম বন্দরের শেডে পড়ে রয়েছে।
কাস্টমস আইন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে গাড়ি আসার ৩০ দিনের মধ্যে ডেলিভারি নেওয়া না হলে নিলামে বিক্রি করা যাবে। সর্বশেষ বিগত সরকারের ২৪ এমপির গাড়ি বন্দরে আসার ৩০ দিনের মধ্যে ডেলিভারি না নেওয়ায় গাড়িগুলোর তালিকা কাস্টমসের কাছে পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই তালিকা অনুযায়ী নিলাম ডাকার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে কাস্টমস। আমদানিকারকের বিপরীতে শেষবারের মতো চিঠিও ইস্যু করেছে যে, শুল্ক দিয়ে এসব গাড়ি ডেলিভারি নেওয়ার জন্য। যদি ডেলিভারি নেওয়া না হয় তাহলে এগুলো নিলামে বিক্রি করা হবে। এমপিদের গাড়ি যদি নির্ধারিত সময়ের পর নিলামে ওঠানো যেতে পারে তাহলে বছরের পর বছর বন্দরের ভেতরে থেকে নষ্ট হয়ে যাওয়া গাড়িগুলো কেন নিলামে ওঠানো হয়নি? এমন প্রশ্ন বিডারদের। এখন গাড়িগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়ার পর ইনভেন্টরি করা হলো। মামলার কারণে ১৯৫টি গাড়ি পড়ে রয়েছে। ইয়ার্ডে পড়ে থাকা বাকি ১০২টি গাড়িও নষ্ট হয়ে গেছে।
মামলা ছাড়া অবশিষ্ট ১০২টি গাড়ির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে কাস্টমস নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার সাকিব হোসেন বলেন, বাকিগুলো আর চলাচলের উপযোগী নয়। তাই এসব গাড়ি নিলামে বিক্রি করা হলে তা রাস্তায় চলাচল করতে পারবে কি না, সেজন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কাছে জানতে চাওয়া হবে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ওইসব গাড়ি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে খোলা আকাশের নিচে বছরের পর বছর পড়ে থেকে গাড়িগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে পুরনো গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাস্টমসের নিলাম নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এসব গাড়ি নষ্ট হয়েছে। কাস্টমস চাইলে এসব গাড়ি নিলামে বিক্রি করতে পারত। কিন্তু তারা তা না করে একাধারে বন্দরের যেমন ক্ষতি করেছে, তেমনিভাবে দেশের আর্থিক ক্ষতিও করেছে। এসব গাড়ি ডলারে কেনা হয়েছে। আবার গাড়িগুলো ব্যবহার না হওয়ায় এগুলোর সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম।’
চট্টগ্রাম বন্দরের পি শেডের পাশের ডাম্পিং ইয়ার্ডে এত বছর ধরে গাড়িগুলো পড়ে রয়েছে। গত ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা বন্দরের ইয়ার্ড পরিদর্শনের সময় এসব গাড়ি দেখে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার পর কিছু গাড়ি বহুতল কার শেডে রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই স্থানে ইয়ার্ড নির্মাণের কাজ করছে। বন্দরের ভেতরে কনটেইনার ইয়ার্ড হিসেবে জায়গাটি ব্যবহার করা গেলে লাভবান হবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রমে গতি আসবে। এখন এই জায়গাটি দখল করে রেখেছে পুরনো অকেজো গাড়িগুলো।