সংকট পণ্যের নয় তদারকির

ভারত থেকে গত দুই মাসে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ৯ হাজার ৬৬২ টন চাল আমদানি হয়েছে। সর্বশেষ চালানে গত বুধবার মিয়ানমার থেকে আরও ২২ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। পাশাপাশি শুল্ক ছাড় দিয়েও কাটেনি ভোজ্য তেলের বাজারের সংকট। চড়া মাছ-মাংসের বাজারও। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সক্রিয় সিন্ডিকেট ও বাজার তদারকি সংস্থার নিষ্ক্রিয়তায় চাল আমদানি করেও বাজারে প্রভাব রাখা যাচ্ছে না। তাছাড়া আগামী রোজা কেন্দ্র করে তেলের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

সরেজমিনে গতকাল বৃহস্পতিবার পলাশী, জিগাতলা কাঁচাবাজার, কাঁঠালবাগান ও উত্তর বাড্ডা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, ৬০ টাকার নিচে কোনো চাল বাজারে নেই। সর্বনিম্ন গুটি স্বর্ণ চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৫৭ টাকায়। অন্যদিকে খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি পাইজাম বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ভালোমানের মিনিকেট ৮৪/৮৫, আটাশ প্রতি কেজির মূল্য ৬৫ টাকা, নাজিরশাল ৮০-৮৫, বাসমতী ৯৫ থেকে ১০০, চিনি গুড়া ১৪০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে চালের অভাব নেই কিন্তু দাম বাড়ার কারণও আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা বেশি দামে কিনলে বেশিতেই বিক্রি করি। যারা আমদানি করেন তারাই কারসাজি করে দাম বাড়ান। হাজার হাজার চালের বস্তা তারা মজুদ করে রাখেন। 

পলাশী কিচেন মার্কেটের এক চাল বিক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক মাসে ধরেই চালের আমদানি হচ্ছে। কিন্তু দেশি চালের থেকে আমদানিকৃত চালের দাম বেশি হওয়ায় বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। সিন্ডিকেট ভাঙতে পারলে বাজারে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসত।

গত ৬ জানুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভারত থেকে চাল আমদানির জন্য বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত চাল আমদানি করতে পারবে। এর আগে গত বছর দুই দফায় আমদানি করা চাল থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শুরুতে চালের দাম কমাতে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করেছিল আমদানি শুল্ক। এতে ফল আশানুরূপ না পেয়ে গত বছরের (১ নভেম্বর) চালের ওপর থাকা সব আমদানি ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয় এনবিআর। এই সিদ্ধান্তের ফলে চালের দাম প্রতি কেজিতে অন্তত ৯ দশমিক ৬০ টাকা কমবে বলে আশা করা হলেও উল্টো বেড়েছে দাম।

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে কর্তৃপক্ষ সেখানে গেলেও চালের বাজারে কেউ যায় না। শুল্ক প্রত্যাহার করলেও বাজারে তদারকির খবর নেই। তদারকি না করলে দাম কমবে কীভাবে? এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধি করে ফায়দা লুটে নিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, মিলার গ্রুপে করপোরেট গ্রুপের ওপর দোষ চাপায়, একইভাবে করপোরেট গ্রুপ মিলারের ওপরে দোষ চাপায়। আমদানি করা চাল মিলে ঢুকছে নাকি বাজারে যাচ্ছে? যদি এই চাল মিলারের কাছে যায় তা হলে আমদানি করে কোনো লাভ হলো না। অর্থাৎ তদারকি করলে দাম কমানো সম্ভব।

এ দিকে তেল নিয়ে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ‘তেলেসমাতির’ ফলে এখনো সংকট কাটেনি। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় ব্যবসায়ীরা মানুষকে জিম্মি করে বারবার তাদের দাবি আদায় করে নেন। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে যে হারে দাম বাড়ান, সেই হারে কখনো দেশের বাজারে তেলের দাম কমান না। উত্তর বাড্ডা এলাকার সায়মা স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তেলের দাম একই আছে, শুধু তেল নেই। সামনে রমজানকে লক্ষ্য করে বড় ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর একটা ফন্দি। ফলে সংকট দেখা দিয়েছে খুচরা বাজারে।

বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ আর খোলা সয়াবিন তেল ১৫৭ টাকায়। খোলা পাম তেলের লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৫৭ টাকা এবং বোতলজাত ৫ লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে ৮৬০ টাকায়।

তবে স্থিতিশীল রয়েছে শীতকালীন সবজির বাজার। গত সপ্তাহের মতো, বাঁধা কপি ও ফুলকপি ২০, শিম ৩০ থেকে ৪০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, মুলা ২০ টাকা, শসা ৪০-৫০ টাকা, ধুন্দল ৬০, চিচিঙ্গা ৭০, বেগুন ৫০-৬০, কলার হালি ৩০, শালগম ৪০, গাজর ৫০, প্রতি কেজি পেঁপে ২৫-৩০ টাকা, টমেটো ৫০, পালংশাক, লাল শাক, পেঁয়াজের কলি প্রতি আঁটি ১০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা, পাইকারিতে কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়।

গত সপ্তাহের তুলনায় মানভেদে প্রতি কেজি আলুর দাম কমেছে ৫ টাকা। ৩০-৩৫ টাকার আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে। এ ছাড়া প্রতি কেজি পেঁয়াজের মূল্য ৫০ থেকে ৬০ টাকা। তবে এসব পণ্যের বাজার ভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে।

এ দিকে গত সপ্তাহের তুলনায় প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম কমেছে ১০ টাকা। ২১০ টাকার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। ৩৪০-৩৫০ টাকার সোনালি ১০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৩৩০-৩৪০ টাকায়। ৮০ টাকার হাঁসের ডিমের হালিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা। অপরিবর্তিত রয়েছে মুরগির ডিম, প্রতি হালির দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকা।