ইসরায়েল আরও ১১০ জন আটক ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে। হামাসের সঙ্গে চুক্তির পর তৃতীয় দফায় বন্দিবিনিময় কার্যকর করা হলো। তিনজন ইসরায়েলি বন্দি ও পাঁচজন থাই শ্রমিকের মুক্তির বিনিময়ে ফিলিস্তিনিরা মুক্তি পেলেন। থাই সরকারের সঙ্গে একটি আলাদা চুক্তির ফলে শ্রমিকরা মুক্ত হয়েছেন। অবশ্য হামাস কর্র্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত জিম্মিদের খান ইউনিসের রেডক্রস কর্মীদের কাছে হস্তান্তর করায় তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছিল, তার প্রতিবাদে ইসরায়েলিরা বন্দিদের মুক্তি দিতে দেরি করে বলে জানা গেছে। বন্দিদের জন্য জিম্মি বিনিময় হলো, যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম পর্যায়ের একটি মূল অংশ যার লক্ষ্য ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক এবং সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের অবসান ঘটানো। ফিলিস্তিনি বন্দিদের বাসে করে পশ্চিম তীরের রামাল্লা শহরে নিয়ে যাওয়ার সময় হাজার হাজার উল্লাসকারী ফিলিস্তিনিকে রাস্তার দুধারে দেখা গেছে। ১৯ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে হামাস এ পর্যন্ত ১৫ জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ১১০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়ায় ইসরায়েলের মুক্তিপ্রাপ্ত মোট বন্দির সংখ্যা ৪০০-তে পৌঁছেছে। বন্দিদের বেশিরভাগ রেডক্রসের বাস থেকে নেমে এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে আনন্দিত সমর্থকদের কাঁধে উঠেছিল, যেখানে জাতিসংঘের তথ্য দেখায় যে, প্রতি পাঁচ ফিলিস্তিনির মধ্যে একজন ইসরায়েলি কারাগারে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং বন্দিদের মুক্তি একটি আনন্দের জাতীয় উদযাপনের উৎস। ফলে স্বদেশিদের প্রত্যাবর্তন ব্যাপারটি প্রায় সব ফিলিস্তিনি অনুভব করতে পারে।
এই বন্দিমুক্তি ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ফিলিস্তিনিরা এর মধ্য দিয়ে নিজেদের সংগ্রামের গুরুত্ব ও একতা আরও বেশি করে অনুভব করতে পারেন। এই জাতীয় ঘটনা তাদের জাতীয় ঐক্যকে আরও সংহত করে। দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষই ইসরায়লের নারকীয় গণহত্যায় বিচলিত ও বিক্ষুব্ধ, কিন্তু এই হত্যা এ যাবৎ থামানো যায়নি। ফিলিস্তিনিদের নিজেদেরই এই নির্মম গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়েছে। তাদেরই রুখে দাঁড়াতে হয়েছে এই অসম লড়াইয়ে, কেবল টিকে থাকার জন্য। তবে ১১০ জনের সবাই বাড়ি ফিরতে পারেননি। এদের মধ্যে ২৩ জনকে আরও গুরুতর অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে আরও নির্বাসনের আগে মিসরে স্থানান্তর করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার মুক্তি পাওয়া বন্দিদের সবাই পুরুষ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৯ বছর।
মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বেশ স্বনামধন্য। জাকারিয়া জুবেদী ছিলেন একজন মিলিট্যান্ট নেতা এবং থিয়েটারের পরিচালক, যিনি ২০২১ সালে জেল ভেঙে পালিয়েছিলেন। তার এই পলায়ন ফিলিস্তিনিদের উদ্বুদ্ধ করে এবং ইসরায়েলিদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরায়। ফিলিস্তিনিদের সেকুলার দল আল ফাতার প্রাক্তন নেতা জুবেদী ছিলেন আল আকসা মারটিয়ার ব্রিগেডের নেতা। ২০০৬ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শেষ হলে জুবেদীর নিজের শহর জেনিনে শরণার্থী ক্যাম্পে একটি থিয়েটারের সূচনা করেন। আজ অবধি ফ্রিডম থিয়েটার শেক্সপিয়ার থেকে শুরু করে স্ট্যান্ডআপ কমেডি এবং শরণার্থীদের লেখা নাটকের আয়োজন করে। জুবেয়েদিকে ইসরায়েলি সেটেলারদের হামলার অভিযোগে ইসরায়েল গ্রেপ্তার করলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। ২০২১ সালে তিনি পাঁচজন কয়েদিসহ ইসরায়েলের ম্যাক্সিমাম-সিকিউরিটি বন্দিশালা থেকে পালাতে সক্ষম হন, যা তাকে কিংবদন্তিতে পরিণত করে। অবশ্য পরদিনই তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। গত বছর ইসরায়েলিদের এক ড্রোন বোমা হামলায় জুবেদীর পুত্র মোহাম্মদ নিহত হন। মুক্তি পাওয়ার পর জুবেদীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা ফিলিস্তিনি ডাক্তাররা জানিয়েছেন তার স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে তবে তিনি মানসিকভাবে অটুট আছেন।
৪২ বছরের মোহাম্মদ আরাদেহও কিশোর বয়স থেকেই ইন্তি ফাদায় যুক্ত হয়েছিলেন। জুবেদীর সঙ্গে কারাগার ভেঙে পালানোর পাঁচজনের একজন তিনি। পশ্চিম জেরুজালেমের তিন নাগরিক ৫২ বছর বয়সী মোহাম্মেদ ওদেহ, ৫৪ বছর বয়সী ওতাইল কাসিম এবং ৪৮ বছর বয়সী উইসাম আব্বাসীও বৃহস্পতিবার মুক্তি পেয়েছেন। তাদের তিনজনই দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তেলআবিবে ২০০২ সালে আত্মঘাতী এক বোমা হামলায় ১৫ জন নিহত হয়। এই হামলার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তিনজনের মধ্যে ওদেহকে নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি সে সময় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পেইন্টার হিসেবে কাজ করছিলেন। এই তিনজনকে মিসরে পাঠানো হয়েছে। আরও তিনজন, আবু হামিদ ভাইয়েরাও মুক্তি পেয়েছেন। নাসির, মোহাম্মদ এবং শরীফকেও মিসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের ভাই নাসের আবু হামিদ ছিলেন আল আকসা ব্রিগেডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ২০২২ সালে যকৃতের ক্যানসারে মারা যান। তাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও তাদের মা, ৭২ বছরের লতিফা আবু হামিদ তার লড়াই থামাননি।
আরও মুক্তি পেয়েছেন ইসরায়েলের কারাগারে সবচেয়ে বেশি সময় একটানা আটকে থাকা বন্দি ৬৭ বছরের মোহাম্মদ আল তুস। ফাতাহ পার্টির এই সদস্য ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে ১৯৮৫ সালে কারাবরণ করেন। এরপর টানা ৩৯ বছর তিনি কারাগারে ছিলেন। তাকেও মিসরে পাঠানো হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জন্য এই মুক্তি দীর্ঘ লড়াইয়ের একটি ধাপ মাত্র। গত পনেরো মাসের বেশি সময় ধরে ইসরায়লের নির্মম হামলায় গাজা এলাকা প্রায় ভস্মীভূত হয়ে গেলেও ফিলিস্তিনিরা তাদের লড়াই থামাননি। বিশ^ মানবতা ইসরায়েলকে থামাতে ব্যর্থ হলেও বন্দিবিনিময় চুক্তিটি সাময়িক সময়ের জন্য হলেও স্বস্তি এনেছে। তবে ইসরায়েল যে দমেনি তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যুদ্ধবাজনেতা নেতানিয়াহুর আলাপে। তিনি ইসরায়েলি বন্দিদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে এই যুক্তিতে ইতিমধ্যেই জল ঘোলা করার চেষ্টা করছেন। নেতানিয়াহু জানেন, সারা বিশ্বের মতামত উপেক্ষা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই না, ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার নতুন করে হোয়াইট হাউজে ফিরে আসার পর তিনিই প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে সেখানে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। ফলে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম এখানেই থামবে বলে মনে হচ্ছে না।
লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক
faizbsu002@gmail.com