চিকিৎসায় জনদুর্ভোগ বাড়বেই!

২০১২ সালে স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিগত সরকার ২০৩২ সালের মধ্যে রোগীর নিজের পকেট থেকে দেওয়া চিকিৎসা খরচ (আউট-অব-পকেট-পেমেন্ট বা ওওপি) ৩২ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছিল। তবে সেটা ছিল কথার কথা। এরপর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রোগীদের ওপর খরচের বোঝা কমার বদলে শুধু বেড়েই যাচ্ছে। এখন চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে আরও ১৫ শতাংশ। মেডিকেল ডিভাইস আমদানি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে মূলত পড়েছে জনগণ। যেহেতু খরচ বাড়বে, সেই খরচ বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই। বিশেষ করে তাদের, আর্থিক অসংগতির কারণে যাদের পক্ষে সম্ভব নয় বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নেওয়া। রোগীর ঘাড়ে এই বাড়তি টাকা চাপানোর ফলে, জনগণের মৌলিক অধিকারই শুধু লঙ্ঘন করা হচ্ছে না, একইসঙ্গে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উৎকট চিত্রকেই উন্মোচন করেছে।

১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও এ পর্যন্ত এই খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ৮টি। দেশে এই পণ্যের বিশাল বাজার থাকলেও মাত্র ১৫ শতাংশের জোগান আসে বিভিন্ন দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে। বাংলাদেশ মেডিকেল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যান্ড হসপিটাল ইকুইপমেন্ট ডিলার অ্যান্ড ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মেডিকেল ডিভাইসের চাহিদা রয়েছে। শতকরা ৯৫ ভাগের চাহিদা মেটানো হয় আমদানি করে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আইটেমগুলোর মধ্যে কিছু অর্থোপেডিক পণ্য, অস্ত্রোপচারের জীবাণুনাশক, হাসপাতালের আসবাবপত্র, হোম কেয়ার ডিভাইস, ইলেকট্রো-কার্ডিওগ্রাম এবং অন্য ছোট যন্ত্র রয়েছে, যদিও তা স্বল্প পরিসরে। স্বাভাবিকভাবেই এর ফলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এতদিন আমদানির জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে কোনো ধরনের লাইসেন্স গ্রহণ, নিবন্ধন বা অনুমতি নিতে হতো না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে সহজ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমদানি করতে পারতেন আমদানিকারকরা। কিন্তু ২০২৩ সালে ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন’ প্রণয়নের পর এসব সামগ্রী ওষুধ ও কসমেটিকসের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ওষুধ ও কসমেটিকসের মতো এসবের আমদানি ও উৎপাদনেও বেশ কিছু শর্ত বিধিবিধান আরোপ করা হয়। ইতিমধ্যেই এসব শর্ত পূরণে বিভিন্ন হাসপাতালকে চিঠি দিতে শুরু করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। চিঠিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অধিদপ্তরের নিবন্ধন ব্যতিরেকে কেউ কোনো চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কিনতে ও ব্যবহার করতে পারবেন না। নির্দেশ অমান্য করা হলে ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা ১০ বছরের কারাদন্ড অথবা উভয় দণ্ডে দন্ডিত হবেন। আমদানিকারকরা বলেছেন, এসব চিকিৎসাসামগ্রী নিবন্ধনের নামে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) হয়রানি ও স্বেচ্ছাচারিতা করছে। চাহিদা অনুপাতে বৈধভাবে তারা কম পণ্য আমদানির অনুমতি দিচ্ছে। বাকি পণ্য অবৈধ পথে আসছে। প্রতিবেশী ভারতে নিবন্ধন পেতে যেখানে ১২২০ টাকা দিতে হয়, সেখানে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের দিতে হয় ৬৫০০০ টাকা, সঙ্গে আছে জটিলতাও। এতে একদিকে যেমন আমদানি ব্যয় ও সময় বেড়ে যাচ্ছে; তেমনি রোগীদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে মেডিকেল সরঞ্জাম। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এ বিষয়ে স্বতন্ত্র কোনো আইন ও বিধিমালা নেই। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, আমদানির এইরকম জনবিরোধী জটিলতা কোন আইনের বলে তৈরি হচ্ছে? নাকি সরষের ভেতরেই ভূত?

চাহিদা অনুপাতে পণ্য আমদানি হবে না। আমদানি ব্যয় বাড়বে ১০-১৫ শতাংশ। ফলে চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে রোগীদের। তাহলে এক্ষেত্রে সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বক্তব্য কী? সাধারণ মানুষকে নির্মম কশাঘাতে না ফেলে, কোন উপায়ে সমস্যার সমাধান করা যায়, তা সরকারকেই ভাবতে হবে। চিকিৎসা সরঞ্জামাদি আমদানি ও উৎপাদনে স্বতন্ত্র আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং আমদানি নিয়মনীতি সহজ করা হোক। আমরা চাই না, অধিদপ্তরের সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠুক।

মনে রাখতে হবে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়লে জনগণের মধ্যে কিন্তু আস্থার সংকট তৈরি হবে। এর ফলে প্রশ্নের মুখে পড়বে স্বাস্থ্যব্যবস্থা। যার পুরো দায় পড়বে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ঘাড়ে। অবশ্য আমরা বিশ^াস করি, বর্তমান সরকার জনগণসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। তারা জনবান্ধব, এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকা ঠিক হবে না।