পানিতে ডুবে মৃত্যুতেও সাম্প্রদায়িক তকমা!

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছর ২১ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ২৩ জন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু নারী-পুরুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ওই সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয় আলোচ্য সময়ে গ্রামীণ পর্যায়ে ১৭৪টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে; যার অনেকগুলোতেই টার্গেট হয়েছে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। তবে যেসব এলাকায় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সেসব এলাকার সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের ভাষ্য, ঐক্য পরিষদ যাদের মৃত্যুকে ‘ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সংঘাতে’ হয়েছে বলে দাবি করছে, সেগুলোর অধিকাংশই পারিবারিক কলহ, অতিরিক্ত মদপান, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতার জেরে। পুলিশের দাবি, পরিষদ যাদের ‘টার্গেট করে হত্যার’ কথা বলছে, তাদের মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তিও আছেন।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের খবরকে উৎস হিসেবে নিয়ে ২৩ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে। গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে ওই ২৩ জনের ‘মৃত্যুর কারণ’ জানতে সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশের সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে ১৬টি থানার ওসিরা জানিয়েছেন ‘মৃত্যুর’ কারণ।

দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নারী চৈতী পাহানের (৩৫) লাশ উদ্ধার করা হয় জঙ্গলের ভেতর থেকে। গত ২১ সেপ্টেম্বর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের সন্দলপুর গ্রামের এ নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর নানা আলোচনা-সমালোচনা উড়তে থাকে লোকমুখে। একই উপজেলার কাটলা ইউনিয়নের ময়না মোড় এলাকার ধানক্ষেত থেকে ২৩ নভেম্বর লাশ উদ্ধার হয় বৃষনি পাহানের। লাশ উদ্ধারের সময় তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ দুজনই সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন বলে ঐক্য পরিষদের দাবি। তবে স্থানীয় বিরামপুর থানা-পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। থানার ওসি মোমতাজুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি চৈতী পাহান অতিরিক্ত মদপানের কারণে মারা গেছেন। এটি আমরা জানতে পেরেছি সেদিন তার সঙ্গে থাকা অন্য পানসঙ্গীর (নারী) থেকে। অন্য নারীও গ্রেপ্তার আছেন। আর বৃষনি পাহানকে মারা হয়েছে পূর্বশত্রুতার জেরে।’

দিনাজপুর ঘোড়াঘাট উপজেলায় গত ৩ ডিসেম্বর মরদেহ উদ্ধার হয় ভরত চন্দ্র দাস নামে এক অটোভ্যান চালকের। উপজেলার কালুপাড়া পিটানিগাছা গ্রামের ভরতের মৃত্যুকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ঘোড়াঘাট থানার ওসি মো. নাজমুল হক বলেন, ‘এটা ছিনতাইয়ের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। আমরা প্রাথমিক তদন্তে এটা পেয়েছি। বিস্তারিত জানা যাবে বিশদ তদন্তের পর।’

পুলিশের ভাষ্য, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের কৈজুরি ইউনিয়নে পূর্বশত্রুতার কারণে সংঘর্ষে জড়িয়ে প্রাণ হারান মানুদাকান্ত লাহিড়ী। এ মৃত্যুকেও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শাহজাদপুর থানার ওসি মো. আসলাম আলী বলেন, ‘এটা খুব সিম্পল ঘটনা। পুরনো শত্রুতার কারণে দুপক্ষের মারামারি হয়। এতে প্রাণ হারান মানুদাকান্ত। এ মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছিল, তারা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে গেছে।’

নড়াইলের সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের পোড়াডাঙ্গা গ্রামে গত ২৭ ডিসেম্বর ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাসনা মল্লিককে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে নড়াইল সদর থানা-পুলিশ। তবে এ ঘটনায় সাম্প্রদায়িক কোনো যোগসাজশ পায়নি পুলিশ। থানার ওসি মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোনো ঘটনা নেই। এই নারীকে অন্য ছেলের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় পেয়ে স্থানীয় কিছু মানুষ বাজে আচরণ করেছে এটা সত্যি। তবে এতে কোনো সাম্প্রদায়িক সংশ্লিষ্টতা নেই।’

গত বছর ১৭ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জে সদর থানার যাদবপুর ঘাট থেকে মহানন্দা নদীতে ভাসমান অবস্থায় খয়রাবাদ হাজী সদর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তন্ময় কুমারের (১৭) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

১৩ অক্টোবর নিখোঁজের পর থেকে তার পরিবারের দাবি এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সদর থানার ওসি রইসউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা নয়। প্রতিমা বিসর্জনে গেলে দুর্ঘটনাবশত নদীতে পড়ে যায়। তন্ময় সাঁতার জানত না। নদীতে পড়ার চার দিন পর নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু হয়েছে।’

১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা নটর ডেম কলেজের অফিস সহকারী লিপিকা গোমেজের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনাটি পিবিআইতে তদন্তাধীন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ডিএমপির সূত্রাপুর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাসায় চোর ঢুকে চুরি করতে গেলে লিপিকার ঘুম ভেঙে যায়। পরে তাকে হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনার বিষয় নেই।’

সেপ্টেম্বরে পাহাড়ে চুরির অভিযোগে একজনের মৃত্যু নিয়ে আদিবাসী ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই সংঘর্ষের মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর অনিক চাকমা মারা যান। এখানে একটি মবের মতো সৃষ্টি হয়। এখানে সাম্প্রদায়িক কোনো বিষয় নেই বলে জানান রাঙ্গামাটির সদর থানার ওসি শাহেদ হাসান।

১৬ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর শাহমখদুম থানা এলাকায় আদিবাসী রানী (৫০) নামে এক নারীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে ওই থানার ওসি মসুমা মোস্তারীন বলেন, ‘পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পারিবারিক কারণে এ হত্যা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

২৪ সেপ্টেম্বর যশোরের অভয়নগরে সবিতা রানী দে (৪৮) নামে এক নারীর মরদেহ প্রতিবেশীর সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে অভয়নগর থানার ওসি মো. এমাদুল করিম বলেন, ‘এটি একটি দুর্ঘটনা। ওই নারী প্রতিবেশীর খামারে কাজ করতেন। বৈদ্যুতিক শকে তার মৃত্যু হয়। পরে মালিক ভয় পেয়ে তার মরদেহ সেপটিক ট্যাংকির মধ্যে রাখেন। এটা কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা নয়।’

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে ১৬ অক্টোবর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রেখা রাসি রায় (৬৫) নামে একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ বিষয়ে পরিদর্শক (তদন্ত) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘টাকা দিয়ে সুদের ব্যবসা করতেন ওই নারী। একজনের সঙ্গে কিছু টাকা নিয়ে ঝামেলা থাকায় এ হত্যা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ মামলা পিবিআইতে তদন্তাধীন।’

২৮ অক্টোবর গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায় স্মৃতি রানী (২৬) নামে এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই থানার ওসি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এটি একটি পারিবারিক ঘটনা। এটা সাম্প্রদায়িক কোনো ঘটনা নয়।’

৮ নভেম্বর লক্ষ্মীপুর সদর এলাকায় হীরা লাল দেবনাথ (৫৫) নামে একজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় সদর থানার ওসি মো. আব্দুল মোন্নোফ বলেন, ‘এটি একটি ডাকাতির ঘটনা। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যার মধ্যে দুজন স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছে। এটা কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা নয়।’

১৩ নভেম্বর বাগেরহাটের চিতলমারী এলাকায় ব্যবসায়ী খিতিশ চন্দ্র গাইনকে (৬৫) হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ওই থানার ওসি শাহদত হোসেন বলেন, ‘জমিসংক্রান্ত বিরোধ থেকে তাকে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন দুপক্ষের ঝামেলা থাকায় এই হত্যার ঘটনা। এখানে সাম্প্রদায়িক কোনো ঘটনা নেই। এ ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।’

ডিএমপির সবুজবাগে বিধান মন্ডল (১৯) নামে এক অটোরিকশা চালককে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ওই থানার ওসি ইয়াসিন আলী বলেন, ‘অটোরিকশা ছিনতাইকালে ছিনতাইকারীরা তাকে হত্যা করে। এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনার কিছু নেই।’

ঐক্য পরিষদের বাদী ও হত্যাকাণ্ডের শিকারদের তালিকার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এই ব্যাপারে নিরপেক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসনকে কাজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদের কাছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ২৩ জনের যে তালিকার কথা বলেছে এর প্রত্যেকটি ঘটনায় কিন্তু পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছে। তদন্তে উঠে এসেছে এর আগের এমন অধিকাংশ ঘটনার ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত যা পাওয়া এর কোনোটিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোনো বিষয় নেই। কোনো কোনোটি সাধারণ অপরাধের ঘটনা, কোনোটিতে দুর্ঘটনা বা তাদের পারিবারিক ঝামেলা এ ধরনের ঘটনাও আছে। সে ক্ষেত্রে যে তালিকা তারা দিয়েছে সে তালিকার বিষয়েও পুলিশ প্রশাসন কাজ করছে। শিগগিরই এ বিষয়গুলোতে সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হবে আসলে যে তালিকা তারা দিয়েছে এ তালিকায় যারা মারা গেছে তাদের মৃত্যুর কারণ কী। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা যে তথ্যটুকু পেয়েছি শেষ পর্যন্ত এতে জানা গেছে, কোনো ঘটনাতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোনো বিষয় নেই। তারপরও পুলিশ খুবই নির্মোহভাবে এসব ঘটনার তদন্ত করবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক ইনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে তালিকাটির কথা বলছেন তা এখনো হাতে পাইনি। পেলে বিস্তারিত বলতে পারব। তবে এটা নিয়ে আমাদের স্থানীয় থানা-পুলিশ কাজ করছে।’