নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার (পণ্যবাহী জাহাজ) কিনছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই জাহাজ দুটি কেনার জন্য ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনও পাওয়া গেছে। জাপানি ইকুইপমেন্টে চীন থেকে কেনা হতে পারে নতুন এই দুই জাহাজ। এছাড়া নতুন করে জিটুজি পদ্ধতিতে চীন থেকে আরও চারটি জাহাজ কেনা হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিএসসির বহরে নতুন করে যুক্ত হবে ছয় জাহাজ। তবে বিএসসি আগামী পাঁচ বছরে তাদের জাহাজের সংখ্যা ২৭টিতে উন্নীতকরণের পরিকল্পনা নিয়েছে।
সর্বশেষ ২০১৯ সালে এমভি ‘বাংলার অগ্রগতি’, ‘বাংলার অগ্রযাত্রা’ এবং ‘বাংলার অগ্রদূত’ নামে তিনটি অয়েল ট্যাংকারকে নিজেদের বহরে যুক্ত করেছিল বিএসসি। এর আগে ২০১৮ সালে যুক্ত হয়েছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এবং ‘বাংলার অর্জন’ নামে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার। এরপর আর কোনো জাহাজ বহরে যুক্ত হয়নি। পাঁচ বছর পর ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় ছয়টি মাদার ভ্যাসেল কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ৮৫০ কোটি টাকায় নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার এবং জিটুজি চুক্তির আওতায় চীন থেকে কেনা হবে বাকি চারটি জাহাজ। এতে বছরে লাভ হবে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা।
নতুন জাহাজ কেনার কথা জানিয়ে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৫৫ থেকে ৬৬ হাজার টন ধারণক্ষমতার দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার বিএসসি নিজস্ব অর্থায়নে কিনবে। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনও পাওয়া গেছে। এখন আমরা কোন পদ্ধতিতে এ দুই জাহাজ কিনব, তা ঠিক করব। তবে অবশ্যই জাপানিজ ইকুইপমেন্ট সমৃদ্ধ জাহাজ কেনা হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ম্যানুফেকচারিং কোন দেশের হবে তা আলোচনা সাপেক্ষ। জাপানে ম্যানুফেকচারিং হলে দাম অনেক বেশি হয়ে যাবে। আমরা সাশ্রয়ীমূল্যে জাহাজ দুটি কিনতে চীন বা অন্য দেশের ম্যানুফেকচারিংকে অগ্রাধিকার দিতে পারি।’
নিজস্ব অর্থায়নে কীভাবে কিনছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএসসি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমাদের অর্জিত লাভ দিয়ে এই জাহাজ দুটি কিনছি। এ ছাড়া জিটুজি পদ্ধতিতে আরও চারটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া অব্যাহত।’
বিএসসি সূত্রে জানা যায়, নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার কিনলেও চীন থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় চারটি জাহাজ কিনতে যাচ্ছে। এ চারটি জাহাজের মধ্যে ১ লাখ ১৭ হাজার টন জ্বালানি তেল বহন সক্ষমতার দুটি অয়েল ট্যাংকার এবং বাকি দুটি হলো ৮১ হাজার ৫০০ টন ধারণ ক্ষমতার বাল্ক ক্যারিয়ার। নতুন এই ছয়টি যুক্ত হলে বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা হবে ১১টি। আগে থেকে বহরে থাকা পাঁচটি জাহাজের মধ্যে দুটি বাল্ক এবং তিনটি অয়েল ট্যাংকার। সর্বশেষ গত অক্টোবরে অগ্নিদুর্ঘটনায় এমটি ‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘বাংলার সৌরভ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই দুই জাহাজ সম্প্রতি নিলামের মাধ্যমে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিক্রি করা হয়। এতে সরকার ৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা রাজস্ব পেয়েছে। বিএসসি ১৯৮৭ সালে তৎকালীন সময়ে ৬০ কোটি টাকায় এই দুই জাহাজ কিনেছিল। জাহাজ দুটি থেকে বিএসসি প্রতি বছর গড়ে ৪০ কোটি টাকা করে নিট লাভ করেছে।
বিএসসির নতুন জাহাজ কেনার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শিপিং বিষয়ে অভিজ্ঞ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, ‘বিএসসির বহরে এর আগেও জাহাজের সংখ্যা বেশি ছিল। কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বিএসসি লাভের মুখ দেখতে পারেনি। তাই নতুন জাহাজ যুক্ত করার পাশাপাশি যুগোপযোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া কনটেইনার পরিবহনবাহী জাহাজও বিএসসির বহরে যুক্ত করতে হবে।’
এ বক্তব্যের বিষয়ে বিএসসির এমডি কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে বিএসসি ট্যাংকার ম্যানেজমেন্ট সেল প্রতিষ্ঠা করেছে, বিএসসি ট্রেনিং সেন্টার চালু করেছে এবং প্রি-অডিট ব্যবস্থাপনা ও প্রি-ইন্সপেকশন ব্যবস্থা চালু করেছে। তাই বলা যায়, ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিএসসি অনেক আধুনিক।’
কনটেইনার ভ্যাসেল আমদানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ছয়টি কনটেইনারবাহী জাহাজ সংগ্রহের জন্য অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এই ছয় জাহাজের প্রতিটিতে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ একক কনটেইনার পরিবহন করা যাবে।’
আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘বিএসসির বহরে বর্তমানে পাঁচটি জাহাজ রয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে কেনা হচ্ছে দুটি। জিটুজি পদ্ধতিতে আরও চারটি কেনা হচ্ছে। এ ছাড়া চীন থেকে আরও চারটি জাহাজ কেনার প্রস্তাবনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে চীন ও কোরিয়া থেকে আরও ১২টি জাহাজ সংগ্রহের আলোচনা চলছে। এতে আগামী পাঁচ বছরে বর্তমান জাহাজসহ বিএসসিতে জাহাজের সংখ্যা হবে ২৭টি।’
দেশে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়লে অবশ্যই এর সুবিধা পাওয়া যাবে। আমাদের নাবিকরা যেমন কর্মসংস্থানের সুবিধা পাবেন তেমনিভাবে ফ্ল্যা প্রোটেকশান আইনের আওতায় দেশীয় জাহাজ পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে বেশি ভিড়তে পারবে। এতে টাকা দেশের বাইরে যাবে না। আর্থিকভাবে লাভবান হবে দেশ।