সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য মাছে-ভাতে থাবা

আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে দীর্ঘসময় ধরে ‘মাছে-ভাতে’ প্রবচনটি বহুল প্রচলিত ছিল। বর্তমানে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। নদী ও জলাশয়ের দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত মাছ আহরণ, কৃষিজমির সংকোচনের কারণে মাছ ও ধানের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের হস্তক্ষেপে চাল ও মাছের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বর্তমানে চালের ভরা মৌসুম তারপরও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাল আমদানি করা হচ্ছে। তারপরও চালের বাজার এখনো অস্থিতিশীল। শুধু চাল নয়, মাছের দামও বেশ চড়া। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৮ লাখ ২৯ হাজার ২৬৬ হেক্টর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৪ কোটি ৬ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। যা বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত। এরপরেও চাল আমদানি করা হচ্ছে। এরপরও চালের বাজার আকাশছোঁয়া।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। শুধু নদী নয় অপার সমুদ্রের জলরাশিও রয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় মোট ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকা এখন আমাদের। সঙ্গে রয়েছে ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার। সমুদ্র থেকে প্রায় ৭-৮ লাখ মেট্রিক টন মাছ প্রতি বছর আহরণ করা হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিমরাড) গবেষকরা বলছেন উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মৎস্য আহরণকারীদের মাধ্যমে সমুদ্র থেকে প্রায় ৮০ লাখ টন মাছ আহরণ সম্ভব। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে সব জলাশয় এবং সমুদ্র মিলিয়ে মোট ২২ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যা জনগণের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে, মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও, উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। কারণ হচ্ছে শিল্পবর্জ্য, কৃষি, রাসায়নিক এবং প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে নদী ও জলাশয় দূষিত হচ্ছে, যা মাছের বাস্তুসংস্থান নষ্ট করছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রধান নদীগুলোর পানির মান নিম্নমুখী, যা মৎস্য সম্পদের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত মাছ ধরা, বিশেষ করে অপরিণত মাছ আহরণের ফলে অনেক দেশীয় এবং সামুদ্রিক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ২৬ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে কৃষিজমি ও জলাশয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা চাল ও মাছ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত দশ বছরে কৃষিজমির পরিমাণ ১.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ও সরবরাহ সংকটের কারণে মাছ ও চালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশ ছিল। যা জনমনে সংকটের উদ্ভব ঘটায়। এর পাশাপাশি রয়েছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।

পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল ও মাছের মজুদ থাকার পরও অসাধু শ্রেণি সাময়িক সংকট সৃষ্টি করে মাছ ও চালের দাম বাড়াচ্ছে। কিছু কিছু ব্যবসায়ী আবার ইচ্ছাকৃতভাবে চাল আমদানি কমিয়ে বাজার চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এসব কারণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের জন্য কৃষিজমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে। উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। জলবায়ু সহনশীল বীজ এবং প্রকৃতি এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতিসাধন যাতে না হয়, এমন কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। যাতে উৎপাদন আরও বাড়ানো যায় পাশাপাশি পরিবেশও রক্ষা পায়। মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা জরুরি এবং মৎস্য অধিদপ্তর থেকে মাছের একটি নির্দিষ্ট আকার এবং আপেক্ষিক ওজন নির্ধারণ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এর ফলে অকারণে অধিক ছোট মাছ জালে ধরা পড়লে সেগুলো সঠিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিল্প ও কৃষিবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাছের নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন ও সংরক্ষণে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। মাছ চাষ এবং মাছের রক্ষণাবেক্ষণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা, যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে বেশি মাছের উৎপাদন করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হলো মাছ ও চালের সরবরাহ চেইন উন্নত করে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেট-মুক্ত বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে, সরকারি মনিটরিং আরও জোরদার করা দরকার। একইসঙ্গে জনসচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল পর্যায় থেকে পরিবেশ ও মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন অসম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নই ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তাকে এগিয়ে রাখবে। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা এবং জনজীবনে স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে হলে সরকার, জনগণ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। এর মাধ্যমেই কৃষি এবং মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি করে বাজার নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী সমাধান আসবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ ইডেন মহিলা কলেজ

 proggadas2005@gmail.com