শুরায়ি নেজাম, তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের আয়োজনে ছয় দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের প্রথম ধাপের বিশ্ব ইজতেমা আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে গতকাল রবিবার শেষ হয়েছে। তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মাওলানা বাংলাদেশের কাকরাইল মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মোহাম্মদ জুবায়ের আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন। মোনাজাতে তিনি মুসলিম উম্মাহর সুদৃঢ় ঐক্য, দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি, দেশের কল্যাণ কামনা করেন। তিনি আরবি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় মোনাজাত করেন। ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এ মোনাজাতে লাখ লাখ মুসল্লি আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে নিজের গুনাহ মাফের জন্য ফরিয়াদ জানান। এ সময় আমিন আমিন ধ্বনিতে পুরো ইজতেমা এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
৫৮তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্য দুই হাত তুলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়। মুসল্লিরা মহামহিম ও দয়াময় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের আশায় আকুতি জানান।
ভোর থেকে দিকনির্দেশনামূলক বয়ানের পর লাখ লাখ মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে সকাল ৯টা ১১ মিনিটে। প্রায় ২৪ মিনিট স্থায়ী আখেরি মোনাজাতে বিশাল এলাকা জুড়ে হঠাৎ নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। এ সময় অনেক মুসল্লি কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রথম প্রায় ১১ মিনিট ধরে মোনাজাতে মাওলানা জুবায়ের পবিত্র কোরআন-হাদিসের আলোকে বর্ণিত দোয়ার আয়াতগুলো উচ্চারণ করেন। পরে ১৩ মিনিট বাংলা ভাষায় মোনাজাত করেন। মোবাইল ফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের আরও লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। অনেকে বিমানবন্দর গোলচত্বর কিংবা উত্তরা থেকে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন।
এদিন রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুর ছিল প্রায় ফাঁকা। আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণিবিতান, অফিসসহ সবকিছু ছিল বন্ধ।
কোনো বিরতি না দিয়ে আজ সোমবার থেকে শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের দ্বিতীয় ধাপ। ৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে প্রথম পর্বের দুই ধাপের বিশ্ব ইজতেমা। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার থেকে মাওলানা সাদ অনুসারীদের তিন দিনের বিশ্ব ইজতেমা হওয়ার কথা রয়েছে।
গতকাল সকালে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি পায়ে হেঁটেই টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা স্থলে পৌঁছেন। সকাল ৮টার আগেই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলিগলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। ভোর থেকেই ফজরের নামাজ ও আখেরি মোনাজাতের জন্য পুরনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী বাসাবাড়ি-কলকারখানা-অফিস-দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলের চারপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কোথাও তিলধারণের ঠাঁই ছিল না।
মুসল্লিদের বাঁধভাঙা জোয়ার : বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীরা তো ছিলেনই, শুধু আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ছুটে আসতে থাকেন শনিবার থেকেই। বাস, ট্রাক, মিনিবাস, কার, মাইক্রোবাস, ট্রেন ও লঞ্চে করে টঙ্গীতে পৌঁছে অবস্থান নিতে শুরু করেন। রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন ভিড় এড়াতে নানা ঝক্কি-ঝামেলা উপেক্ষা করে রাতেই টঙ্গীমুখো হন। সকাল ৮টার মধ্যে গোটা এলাকা জনতার মহাসমুদ্রে পরিণত হয়।
মোনাজাত শেষে জনজট ও যানজট : আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে আশা মানুষ নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। আগে যাওয়ার জন্য মুসল্লিরা তাড়াহুড়া করতে শুরু করে। এতে টঙ্গীর কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক এবং সংযোগ সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট। বিপুলসংখ্যক মানুষকে পরিবহনের ব্যবস্থা করা এবং লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে ইজতেমা ময়দান ত্যাগ করায় জনজট ও যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজট নিরসন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়।
গাজীপুর ও টঙ্গীর সব কারখানায় ছুটি : বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে গাজীপুর ও টঙ্গীর সব কারখানায় ছুটি ছিল। ফলে এবার এসব কারখানার শ্রমিকদের ইজতেমায় আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে সমস্যা হয়নি।
মোনাজাতে নারীদের অংশগ্রহণ : বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে বিপুলসংখ্যক নারীরা অংশ নিয়েছেন। ইজতেমায় নারীদের অংশ নেওয়ার কোনো বিধান না থাকলেও আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন বয়সী নারী মুসল্লিও আগের দিন রাত থেকে ইজতেমা ময়দানের আশপাশে, বিভিন্ন মিলকারখানা, বাসাবাড়িতে ও বিভিন্ন দালানের ছাদে অবস্থান নেন। ভোর থেকে নারীরা ইজতেমা ময়দানের পাশে টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল মাঠ, ইজতেমা মাঠের পশ্চিম পাশে কামারপাড়া ও আশপাশের খোলা ময়দানে অবস্থান নেন।
বিদেশি মুসল্লি : এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে ৭৬ দেশের ৩ হাজার ৫০ জন বিদেশি মুসল্লি যোগ দেন। তাদের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান থেকে সর্বাধিক মুসল্লি অংশ নেন।
ছয় মুসল্লির মৃত্যু : বিশ্ব ইজতেমায় গতকাল দুপুর পর্যন্ত ছয়জন মুসল্লি মৃত্যুবরণ করেছেন। দুপুরে অহিদ মিয়া (৫০) নামে এক মুসল্লি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া থানার আখাউড়া মসজিদপাড়া এলাকার চান মিয়ার ছেলে। তিনি দুপুর ১২টার দিকে তিন নম্বর খিত্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে শনিবার রাতে ইজতেমা ময়দানে আরও এক মুসল্লি ইন্তেকাল করেন। তার নাম হাজি আবদুল গফুর (৭৫)। তার বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন থানায়।
শনিবার মাগরিবের নামাজের আগে তিনি তার নিজ খিত্তায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ছয়জন। শুরায়ি নেজাম, তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ ছাড়া গত শনিবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে ইজতেমা ময়দানে এক মুসল্লি মৃত্যুবরণ করেন। তার নাম রমিজ আলী (৬০), তিনি হবিগঞ্জ সদরের রামনগর ৩ নম্বর তেগরিয়া এলাকার মৃত দোস্ত মোহাম্মদের ছেলে। শুক্রবার রাতে এক মুসল্লি মৃত্যুবরণ করেন। তার নাম ইয়াকুব আলী (৬০)। তিনি হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল থানার রাগবপুর গ্রামের মৃত নওয়াব উল্লার ছেলে। শুক্রবার দুপুরের দিকে শেরপুর ৪৬ নম্বর খিত্তায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন ছাবেদ আলী নামে এক মুসল্লি। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খুলনা জেলার আবদুল কুদ্দুস গাজী নামে আরেক মুসল্লি মৃত্যুবরণ করেন। ইজতেমা ময়দানে জানাজা শেষে তাদের লাশ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যসেবা : টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে গত তিন দিনে ২ হাজার ৯ জন এবং ছয়টি অস্থায়ী ক্যাম্পের মাধ্যমে ১১ হাজার ২৯৭ জন অসুস্থ মুসল্লিকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ওই হাসপাতালে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ২৪ এবং ১২ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওই হাসপাতালের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রথম পর্বের মতো ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান অব্যাহত থাকবে। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা বেশিরভাগই পেটের পীড়ায় আক্রান্ত বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
ইজতেমায় মোনাজাতের সময় দুই স্থানে ড্রোন আতঙ্ক, আহত অর্ধশতাধিক : টঙ্গীর তুরাগ তীরে আখেরি মোনাজাত পরিচালনার সময় দুটি স্থানে ড্রোন আতঙ্কে অর্ধশতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন। এর একটি ঘটনা ঘটে ইজতেমা ময়দানের উত্তরপ্রান্তে বিদেশি নিবাসের পূর্বদিকে। এখানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ড্রোন টিনের ছাউনির ওপর পড়ে যায়। এতে বিকট শব্দ হয় এবং মুসল্লিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অন্য একটি ড্রোন ইজতেমার পূর্বদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পূর্বপ্রান্তে স্টেশন রোডে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে খেলনা বেলুনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে অর্ধশতাধিক মুসল্লি আহত হন।
টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, একটি ড্রোন আকাশে উড়ছিল। সম্ভবত এটির চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় ২ নম্বর গেটের একটু সামনের এলাকায় আছড়ে পড়ে। এতে মুসল্লিরা অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ নিয়ে তদন্ত চলছে।
ইজতেমার দুই কিলোমিটারের মধ্যে ড্রোন ওড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা : মুসল্লিদের নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ইজতেমা ময়দানসহ আশপাশ এলাকার দুই কিলোমিটারের মধ্যে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ শাখার (সিটিএসবি) অনুমতি ছাড়া যেকোনো ধরনের ড্রোন ও ড্রোন ক্যামেরা ওড়ানো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ড. নাজমুল করিম খান এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা জারি করেন।
গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইজতেমা ময়দানসহ আশপাশ এলাকার দুই কিলোমিটারের মধ্যে সিটিএসবির অনুমতি ছাড়া ২ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ড্রোন ও ড্রোন ক্যামেরা অথবা ভিডিওসহ অন্য কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ওড়ানো বা ব্যবহার না করার জন্য অনুরোধ করা হলো। এ আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।