নির্বাচন কি ডিসেম্বরেই?

যতই দিন যাচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের দাবি ততই প্রবল হচ্ছে। বিরাজমান সামগ্রিক পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রবাহ দেশকে দ্রুত নির্বাচনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং দাবির ফিরিস্তি নিয়ে রাজধানী ঢাকার রাজপথ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল, সমাবেশ, অবরোধ ও কর্মবিরতি ইত্যাদি ঘটনা মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা নিয়ে ইতিমধ্যেই জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন প্রতিনিধির ফেসবুক স্ট্যাটাসের তথ্য বলছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দাবি-দাওয়া নিয়ে দেড়শতাধিক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। আর দাবি-দাওয়ার এই আন্দোলন এখনো বিরামহীন চলছেই। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মূল কাজে কতটা মনোযোগী হতে পারছে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। নির্বাচন সামনে রেখে বেশ কিছু বিষয়ে সংস্কার করা, জুলাই ঘোষণাপত্র তৈরি, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি কমানো, অর্থনীতিতে গতির সঞ্চয় করা, সর্বোপরি দেশকে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সরকারের প্রধান দায়িত্ব। প্রধান উপদেষ্টার কাছে সংবিধান, নির্বাচন, পুলিশ ও দুর্নীতি বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা জমা পড়া ছাড়া সংস্কার বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি নেই। বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের মেয়াদ বাড়ানো হলেও তারা এখন পর্যন্ত প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করতে পারেনি। জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়েও কোনো অগ্রগতি নেই।

কিছুদিন ধরে ্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশনারদের বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, শেখ হাসিনার কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের তিনটি কলঙ্কিত নির্বাচনের পর বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ডিসেম্বরে আয়োজনে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কমিশন অক্টোবরেই নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ করতে চায়। এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের বক্তব্য হলো, প্রধান উপদেষ্টা এ বছরের শেষে অথবা আগামী বছরের প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের রোডম্যাপ ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন তাই ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ গত ৩০ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে এক মতবিনিময় সভায় বলেছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনের সময়সীমা নির্বাচন কমিশনারের হাতে নয়, এটা সরকারের হাতে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে জেনেছি যে, সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর জাতীয় ঐকমত্যের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হবে। সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে আগে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, যাতে করে নির্বাচন কার্যক্রম দ্রুত হাতে নেওয়া যায়। এ অবস্থায় আমরা নির্বাচন কমিশন যেটা করছি, জাতীয় নির্বাচনকে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষিত যে উইন্ডো, উইন্ডোর যে প্রথম দিকটা অর্থাৎ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটা প্রস্তুতি সম্পন্ন করছি। এখন নির্বাচন কখন হবে, এটা একটা ঐকমত্যের বিষয়।’ সাধারণত বাংলাদেশে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশন আভাস দিয়েছে যে, তারা নির্বাচনের জন্য ডিসেম্বরকেই বিবেচনায় রেখে অগ্রসর হচ্ছে। ২০২৬ সালের রমজান মাস, পাবলিক পরীক্ষা এবং বর্ষার কারণে ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ভোটগ্রহণ সম্ভব নয়। কারণ তখন ভোটগ্রহণের অনুকূল পরিবেশ থাকবে না। নির্বাচনের তফসিল এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যে, ভোটের দিনের আগের অন্তত তিন সপ্তাহ দলগুলোকে প্রচারের সুযোগ দেওয়া হয়। এটাও যেন রমজান মাসে বা পাবলিক পরীক্ষার মধ্যে না পড়ে। রমজান, পাবলিক পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসব, বিরূপ আবহাওয়া এসব বিবেচনায় রেখে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সেই হিসেবে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্ভব না হলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন হতে পারে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে।

দেশ কাঁপানো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকদিন পরই ছয় মাস পূর্ণ করতে যাচ্ছে। একেবারে শুরু থেকেই প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার নানামুখী ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রতিটি দিন অতিবাহিত করছে। সরকার সম্ভবত একটি দিনও স্বস্তির সঙ্গে কাটাতে পারেনি। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া বিপর্যস্ত অর্থনীতি, ব্যাংক খাতের লাগামহীন লুটপাট, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার, পুলিশ ও প্রশাসনের দলীয়করণ এসবের দায়ভার বহন করেই সরকারকে পথ চলতে হচ্ছে। এছাড়া আছে প্রতিদিন দাবি-দাওয়ার মুখোমুখি হওয়া। একটি পরিস্থিতি সামাল দিতে না দিতেই আরেকটি পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে। একটি দৈনিক পত্রিকার প্রধান খবরে দেখা যায়, গত ২৮ দিনে ঢাকায় নানা ধরনের দাবিতে ১৬টি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারি মাসে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল মহাসড়ক বন্ধ হয়েছে ১১ বার। যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক যেটাই হোক, দাবি হাসিলের ‘মোক্ষম জায়গা’ হয়ে উঠেছে রাজপথ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যেন বয়ে যাচ্ছে দাবি-দাওয়ার নহর। হুটহাট সড়ক মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে (সমকাল ৩০ জানুয়ারি)। এসব কর্মসূচির ফলে রাজধানীতে হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। অফিসগামী চাকরিজীবী, অন্যান্য কর্মজীবী মানুষ, অসুস্থ রোগীর বিষয়ে এদের যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এর আগে একজন উপদেষ্টা বলেছিলেন, ধান কাটার মৌসুমের মতো দেশে যেন দাবি-দাওয়ার মৌসুম চলছে।

ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা, দেশে যেন আবার ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরশাসনের পুনরুত্থান না হয়। আর এর জন্য সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ-প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার একান্তভাবে জরুরি। এ সবের প্রাথমিক দায়িত্ব প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই বর্তেছে। এ বিষয়ে প্রফেসর ইউনূসের আন্তরিকতা ও নিরলস প্রচেষ্টা নিয়ে সন্দেহের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তবে এর বিপরীতে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত ১৫ বছরে কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের পর দেশকে একটি সঠিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে যাওয়া বা পুনর্গঠন করার জন্য এক থেকে দেড় বছর সময় যথেষ্ট নয়। কারণ যেখানে নির্বাচনব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করা, পুলিশকে পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করা, প্রশাসনকে দলীয়করণ, ব্যাংকিং সেক্টরকে টাকা পাচারের মাধ্যম করা, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- এবং গুম-খুনকে রেওয়াজে পরিণত করা হয়েছিল সেখানে এমন কোনো পন্থা নেই যে সহসা এর থেকে উত্তরণ সম্ভব। ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, উপদেষ্টা পরিষদের যোগ্য, দক্ষ ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম এমন সদস্য কয়জন আছেন? কোনো কোনো উপদেষ্টার কার্যক্রম চোখেই পড়ছে না। তিন চারজন উপদেষ্টা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন সামাজিক মাধ্যমে এমন টিপ্পনি চলছে। স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্রসহ তিনজন উপদেষ্টাকে সহায়তা করার জন্য তিনজন বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে করেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। খুন-খারাবি লেগেই আছে। প্রায় প্রতিদিনই সংঘটিত হচ্ছে হত্যাকাণ্ড। চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্য চলছেই। ‘মব ভায়োলেন্স’ কিছুতেই থামছে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাত, পা ও চোখ হারানো অথবা অন্যভাবে আহতদের সুচিকিৎসা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। রবিবার রাতে আহতদের একটি বিরাট অংশ চিকিৎসার দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। আহতরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার সামনে চলে যান। পরে তারা সুচিকিৎসার আশ্বাস পেয়ে ফিরে যান। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার নিষ্ক্রীয় ভূমিকা নিয়ে শুরু থেকে যে বিস্তর অভিযোগ ছিল, এখনো তা অব্যাহত আছে। বাণিজ্য উপদেষ্টাও সামগ্রিকভাবে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কিছু করতে পারছেন না।

এদিকে বিদ্যমান বাস্তবতায় ন্যূনতম সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত নির্বাচনের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শক্তির মতে, দ্রুত জাতীয় নির্বাচন করা না গেলে সংকট আরও বাড়বে। পরিস্থিতি হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক উত্তরণে উভয় সংকটে বাংলাদেশ। জাতীয় নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, প্রতিশ্রুত সংস্কার শেষ করতে তত চাপে পড়ছে অন্তর্বর্তী সরকার। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক চাপও আছে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তবর্তী সরকার যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল, তাও ম্নান হতে শুরু করছে বলে মনে করে ক্রাইসিস গ্রুপ। গত ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত আইসিজির প্রতিবেদনে গ্রুপের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিয়ান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের হানিমুন শেষ। রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ সংস্কার নিয়ে দর কষাকষি করায় এবং নির্বাচনী সুবিধার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠায় চলতি বছর বাড়তে পারে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।’ এদিকে চলতি মাসে জনসম্পৃক্ত কিছু ইস্যু এবং জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বর্তমানে রাজনীতির মাঠের প্রধান দল বিএনপি ও সমমনা কয়েকটি দল। বিএনপি গত শুক্রবার ১২ দলীয় জোট ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, একটি নির্বাচনের জন্য যা কিছু সংস্কার দরকার, সেগুলো করেই জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার করার জন্য বেশি সময় লাগার কথা নয়।

বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট অভিযোগ করছে যে, সরকারের সংস্কার এবং নির্বাচন নিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক দল গঠন না হওয়া পর্যন্ত সময়ক্ষেপণের কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ জোরালো হচ্ছে। সংস্কার ও নির্বাচনী কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বিষয়টিকে অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর সুযোগ নিয়ে ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরানো আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের কিছু লোকজনের অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। পতিত দলের পক্ষ থেকে সরকারবিরোধী কিছু কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। অজ্ঞাত স্থান থেকে এবং সামাজিক মাধ্যমে আওয়ামী লীগ অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচির ডাক দিচ্ছে। অথচ ক্ষমতায় থাকার সময় শেখ হাসিনা নিজে এবং তার দল হরতালের অবরোধের বিরুদ্ধে কত কথাই না বলেছে। রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতি সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক

printbd20@gmail.com