পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এক দশক ধরে আয়োজিত অমর একুশে বইমেলায় মুজিববন্দনা দেখা গেছে। বইমেলা উৎসর্গ থেকে শুরু করে প্রতিপাদ্য, স্টল-প্যাভিলিয়ন নির্মাণ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি বইমেলায় শতাধিক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা নতুন বই প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত এবারের বইমেলায় পুরো ভিন্ন আবহে আয়োজিত হচ্ছে। আগের সেই মুজিববন্দনার ছিটেফোঁটাও এবার লক্ষ্য করা যায়নি।
বইমেলার তৃতীয়দিন শতাধিক প্যাভিলিয়ন, স্টল ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন করে বই প্রকাশিত হয়নি। পুরনো বইগুলোও রাখেনি অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধুকে ঘিরেই পরিচালিত হতো, সেসব স্টলেও পাওয়া যায়নি বঙ্গবন্ধুর বই। কোথাও কোথাও কিছু বই দেখা গেলেও বিক্রি হচ্ছে না বলে জানান বিক্রয়কর্মীরা। কেউ কেউ বলছেন স্টলে ‘হামলা’ হওয়ার প্রবল আশঙ্কায় বই রাখেননি তারা।
এর আগে ২০২০ সালের বইমেলা উৎসর্গ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেবার বইমেলাকে ভাগ করা হয়েছিল চারটি ভাগে। শিকড়, সংগ্রাম, মুক্তি ও অর্জন যা কি না বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সে সময় শোভা প্রকাশ, সময় প্রকাশনী, আগামী প্রকাশনীসহ অনেক প্রকাশনী তাদের প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর আকৃতি দিয়ে। বইমেলার গত দুই বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পড়ো বই গড়ো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। স্বয়ং বাংলা একাডেমিও গত চার বছরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ২০০-এর বেশি বই প্রকাশ করেছে। প্রায় প্রতিটি প্রকাশনীতেই ছিল বঙ্গবন্ধুর বই নিয়ে আগ্রহ। বঙ্গবন্ধুর আকৃতি নিয়ে প্যাভিলিয়ন নির্মাণে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত। মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনী সংস্থাগুলো বই প্রকাশে প্রাধান্য দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা দিক নিয়ে লেখা বইয়ে। তাই মেলার স্টলগুলোর চারপাশে শোভা পেয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ এবং জীবনীর ওপর লেখা নানা বই। অনেক প্রকাশনী সংস্থা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নামে তৈরি করেছিল পৃথক কর্নারও।
২০২০ সালে শোভা প্রকাশের প্যাভিলিয়নটি সাদা কালো রঙের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নম্বর বাড়ির আদলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৈরি করা হয়েছিল। বাড়ির সামনের অংশে ছিল বারান্দা। সেই জানালার পাশে বসে বঙ্গবন্ধু বই পড়ছেন। আর সময় প্রকাশনী স্টল ছিল রঙিন ঝকঝকে একটি বাড়ি। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু হাত নেড়ে ইশারা করছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগের স্টল মাতৃভূমি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, মহিলা লীগ, জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু বইমেলা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু প্রচার কেন্দ্রে, বঙ্গবন্ধু রিসার্চ সেন্টার, জয় বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্য জোটসহ নানা নামের স্টল দেখা যেত বইমেলায়। সেসব স্টল মূলত বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার বইকে কেন্দ্রে করে গড়ে উঠত। এবারের মেলায় এমন কোনো স্টলের হদিস পাওয়া যায়নি।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড-ইউপিএলের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বইয়ের নাম ছিল ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। তবে এবারের মেলায় তারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন কোনো বই না আনার পাশাপাশি পুরনো বইগুলোও রাখেনি তাদের প্যাভিলিয়নে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বইগুলোও বিক্রি হচ্ছে কম বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বিক্রয়কর্মী নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন পুরনো কোনো বই নেই। কেউ খুঁজতেও আসেন না। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক বইগুলোও কম বিক্রি হচ্ছে।’
প্রথমা প্রকাশনীতে মুজিব ভাই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : কাছে থেকে দেখা, বঙ্গবন্ধু : শ্রদ্ধা ভাবনায় স্মৃতিতেসহ কয়েকটি বই দেখা গেছে। তবে বিক্রয়কর্মী অনুপ জানিয়েছেন, এসব বইয়ে কারও আগ্রহ তেমন দেখা যাচ্ছে না। আর নতুন করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো বই প্রকাশিত হয়নি।
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশ করতে দেখা যেত আগামী প্রকাশনীতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আকৃতি নিয়ে প্যাভিলিয়ন নির্মাণও করতে দেখা গেছে তাদের। প্রতি বছরই নতুন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন বই প্রকাশ করত প্রকাশনীটি। তবে এবার তাদের স্টলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো বই পাওয়া যায়নি। প্যাভিলিয়ন ইনচার্জ রাহুল জানান, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন, পুরনো কোনো বই নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকাশক জানান, আমাদের স্টলে মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি বই বিক্রি হতো এবং প্রকাশিত হতো। এবার আমরা ইচ্ছে করে বঙ্গবন্ধুর বই রাখিনি। আগ্রহও কম থাকবে স্বাভাবিক। এ ছাড়া ‘মব’ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকেও রাখিনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবারের মেলার প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান : নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ’। সেই সঙ্গে মেলার রঙ, প্রতিপাদ্য আর দৃশ্যপটেও এসেছে পরিবর্তন। যেখানে ভাষাশহীদ, ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের পাশাপাশি চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতিও শ্রদ্ধা আর স্মৃতি ধারণ করা হয়েছে। আয়োজকরা বলছেন, এবারের মেলার রঙ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে লাল, কালো ও সাদা। বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে লাল, শোকের প্রতীক হিসেবে কালো এবং আশার প্রদীপ হিসেবে সাদা। জুলাই-অগাস্টের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবারের বইমেলায় গণআন্দোলনকে ফুটিয়ে তুলতে বইমেলায় রাখা হয়েছে ‘জুলাই চত্বর’। শেখ হাসিনার ছবি দিয়ে ডাস্টবিনও দেখা গেছে।
মেলা শুরুর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বইমেলায় বঙ্গবন্ধু প্যাভেলিয়ন ও বই প্রকাশ নিয়ে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে কি না বা বাংলা একাডেমি কোনো নির্দেশনা দেবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কিছু নীতিমালা আছে, সেসব নীতিমালা মানা হবে। সেখানে দেশদ্রোহী, জাতিদ্রোহী, ইতিহাসদ্রোহী, যেগুলো নীতিবিরুদ্ধ, পুস্তক সেসব না রাখার বিষয়ে নীতিমালা রয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত বই প্রকাশিত হবে কি না, মেলায় থাকবে কি না, সে বিষয়ে বাংলা একাডেমির কোনো নির্দেশনা নেই। কিন্তু কোনো প্রকাশক যদি সে বিষয়ে নিজে থেকেই নির্ধারণ করেন, সেখানে বাংলা একাডেমি থেকে করতে বা না করতে বাধ্য করবে না।’
এ বিষয় নিয়ে যদি প্রকাশকদের মধ্যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, তখন বাংলা একাডেমি কী ব্যবস্থা নেবে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, ‘বাংলা একাডেমি কারও নিরাপত্তা বা সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। আমাদের কর্তব্য, যারা সুরক্ষা দেবে তাদের এসব বিষয়ে অবগত করা। মেলাতে যেসব সংকট তৈরি হতে পারে, সেসব বিষয় নিয়ে একাধিক মিটিং করে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যার যে দায়িত্ব কর্তব্য সে সেটা করবে। এরপরও যদি আমাদের কিছু করার থাকে সেসব বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’