‘অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট’, প্রবাদটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে রংপুর রাইডার্স। জয়ের আশায় দুবাইতে আইএল টি২০-তে খেলা ৩ ক্রিকেটারকে রাতেই উড়িয়ে এনে দুপুরে ম্যাচে নামিয়েছিল রংপুর, ৩ জনই ডাহা ফ্লপ। অন্যদিকে গোটা আসর জুড়েই দেশীয় ক্রিকেটারদের ওপর ভর করে এগিয়ে চলা খুলনা টাইগার্স দুই ক্যারিবিয়ানকে উড়িয়ে আনলেও ৮৫ রান তাড়া করে জিততে তাদের দরকারই হয়নি! চিটাগং কিংসের অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুনও সাফ বলে দিয়েছেন, ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ লাগবে না তাদেরও। সব মিলিয়ে বিপিএলের ফাইনালে যাওয়ার শেষ লড়াইতে দেশি ঝাঁঝটাই স্পষ্ট।
একদিকে আসরের সর্বোচ্চ রানের মালিক আর অন্যদিকে এবারের আসরের সবচেয়ে কৃপণ দুই বোলার! দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে মুখোমুখি খুলনা আর চিটাগং, দেশের দুই প্রধান বন্দর নগরীর দুই দল। খুলনা হারিয়ে এসেছে শক্তিশালী রংপুরকে আর চিটাগং কিংস হেরেছে ফরচুন বরিশালের কাছে। ব্যবধান দুই জায়গাতেই সমান, ৯ উইকেট। এবার এই হেরে যাওয়া আর জিতে যাওয়াদের দ্বৈরথই নিষ্পত্তি করবে শিরোপার লড়াইতে বরিশালের প্রতিপক্ষ। দুই দলই মঙ্গলবার বিশ্রামে কাটিয়েছে। চিটাগং কিংস অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন বরিশালের কাছে হারার পরও বলেছেন, কোনো নামি বিদেশি খেলোয়াড় আনবে না তার দল, ‘এখন পর্যন্ত এমন (বিদেশি ক্রিকেটার আনার) পরিকল্পনা নেই। আমরা আসলে এটায় বিশ্বাসীও না। শুধু বড় নাম হলেই হয় না। আমাদের যে বিদেশি ক্রিকেটাররা আছে, তারা পুরো টুর্নামেন্টটা খেলছে। এই কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। আমরা এটা বিশ্বাস করি না যে বড় নাম আনলেই ওরা ডেলিভার করে দেবে। নাও তো করতে পারে’, কারণ হিসেবে বলেছেন ভ্রমণ ক্লান্তির কথা, ‘(তাড়াহুড়ো করে এসে খেলতে নেমে যাওয়া) ক্রিকেটীয় দিক থেকে আদর্শ নয়। রংপুরের ক্রিকেটাররা আজ (গতকাল) সকালে পৌঁছেছে। দীর্ঘ ভ্রমণ করে জেট ল্যাগের ব্যাপার থাকে। প্রথম ম্যাচে আমাদেরও বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার সকালে এসে পৌঁছেছিল।’
‘সেদিন আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, মাঠে তারা শতভাগ দিতে পারছে না। তারাও পরে এটি বলেছে। একজন ক্রিকেটার হিসেবে আমি কখনো মনে করি না এটি আদর্শ কিছু। যত বড় ক্রিকেটারই হোক, আনার পর পরিপূর্ণ বিশ্রাম দিয়ে যদি খেলানো যায়, সেটা আদর্শ’। তাই খাজা নাফে, গ্রাহাম ক্লার্ক, বিনুরা ফার্নান্দো আর হায়দার আলীদের ওপরই ভরসা শন টেইটের দলের। তবে চিটাগং কিংসের তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারেন শামীম হোসেন। প্রথম কোয়ালিফায়ারে ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে ৪৭ বলে ৭৯ রানের একটা ইনিংস খেলেও দলকে জেতাতে পারেননি, কারণ অন্যরা ভালো না করায় দলীয় সংগ্রহটা বড় হয়নি। অধিনায়ক মিঠুন বা গ্রাহাম ক্লার্ক কেউ একজন একপ্রান্তে সঙ্গ দিতে পারলে শামীমের ব্যাটই পারবে চিটাগংকে ফাইনালে তুলতে।
এবারের বিপিএলে সর্বোচ্চ রান মোহাম্মদ নাঈমের। এই আসর দিয়ে যেন নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন এই বামহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। অন্যদিকে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ নিজেই নেমে যাচ্ছেন ইনিংসের গোড়াপত্তনে। বাংলাদেশের ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি দলে মাঝে মাঝেই তাকে এই ভূমিকায় দেখা গেছে। কখনো কাজ করেছে কৌশলটা কখনো করেনি। খুলনা টাইগার্সেও একই রকম পরিস্থিতি। সবশেষ ম্যাচে ০, তবে আগের ম্যাচেই ৭৪* করেছিলেন ৫৫ বলে। নাঈমেরও মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ দেখার অভ্যাস আছে। সেঞ্চুরির পরের ইনিংসটাই ০ রানের, এরপর আবার ৪৮*। ওপর থেকে যদি রান না আসে, তবে মাঝে আর শেষে সামাল দেওয়ার জন্য শিমরন হেটমায়ার আর জেসন হোল্ডার আছেন। মোহাম্মদ নাওয়াজও ব্যাট হাতে কার্যকর। এই তিনজন মিলে মিলিয়ে দিতে পারেন কঠিন অঙ্কও। সঙ্গে মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনও আছেন। তাদের নিয়ে ব্যাটিংটা কার্যকর। বোলিংটাও বুদ্ধিদীপ্ত। নাসুম, মিরাজ নাওয়াজের স্পিনের সঙ্গে হাসান মাহমুদ আর জেসন হোল্ডারের হালকা সুইং বোলিং অস্বস্তিতে ফেলতে পারে চিটাগং কিংসকে। বিশেষ করে খেলাটা যখন রাতে।
এবারে নতুন করে আত্মপ্রকাশের আগে ২০১৩ বিপিএলের ফাইনালই ছিল চিটাগং কিংসের শেষ ম্যাচ। সেবার মোশারফ রুবেলের বামহাতি স্পিনে ধরাশায়ী হয়ে ফাইনালে দর্শক বনে গিয়েছিল সামির কাদের চৌধুরীর দল। ১২ বছর পর ফিরে আসা দলটি কি আবার ফাইনালে উঠবে নাকি এখান থেকেই বিদায় নেবে, সেটাই নিষ্পত্তি করবে আজ সন্ধ্যার ম্যাচ। অন্যদিকে একসময় বাদ পড়ার আশঙ্কায় থাকা খুলনা নকআউট ম্যাচ খেলাটাকে বানিয়ে ফেলেছে অভ্যাস। গোলমালের বিপিএলে কোনো বিতর্কেই না জড়ানো পরিচ্ছন্ন দল খুলনার এই সব শুভচর্চার জন্যই ফাইনালে খেলার যোগ্য দাবিদার।
প্লে-অফের প্রথম দুটো ম্যাচ হয়েছে একদম একপেশে। ফাইনালের আগে একটা রোমাঞ্চকর লড়াই হোক ফাইনালের জায়গার জন্য। তাতে করে ফাইনালটা হয়ে উঠবে আরও আকর্ষণীয়।