চারদিকে অস্থিরতা, ভঙ্গুর অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর বঞ্চিতদের বিক্ষোভের মধ্যে যাত্রা শুরু করে সংস্কারে উদ্যোগী ও ঐক্যের সন্ধানে থাকা অন্তর্বর্তী সরকার ছয় মাস পূর্ণ করেছে। এ সময়ে নানা চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে।
ছয় মাসের ছোট যাত্রায় সরকারের সফলতার পাশাপাশি রয়েছে ব্যর্থতাও। পুলিশ-প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল যে চ্যালেঞ্জ শুরুতেই ছিল, তা এখনো রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, অর্থনীতি, নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাসহ নানা ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। এমনকি গণঅভ্যুত্থানে পরোক্ষভাবে জড়িতদের অনেকেই আশাহত হয়েছেন।
তবে এতকিছুর পরও সরকারের সংস্কারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সেই সঙ্গে এ বছরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা রাজনৈতিক দলসহ সবার মধ্যে আশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে গত বুধবার এক বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সাক্ষাৎকার ইতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। সেখানে ড. ইউনূস বলেছেন, চলতি বছরের শেষে নির্বাচন হতে পারে। তার এ বক্তব্যে ধারণা করা হচ্ছে, সরকার সংস্কারের পাশাপাশি নির্বাচনের দিকেও এগোচ্ছে।
সম্প্রতি সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, শুরুর সময়ের তুলনায় সরকার সমর্থন হারাচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের ওপর চাপও বাড়ছে। গত ৩০ জানুয়ারি সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার যে বিপুল সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল, তা অনেকটা কমতে শুরু করেছে। সরকার শুধু অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির বিভেদ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে না, দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা নিয়েও জনসমালোচনার মুখে পড়েছে। এ ছাড়া প্রতিশ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করতেও চাপে পড়ছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ৮ আগস্ট যাত্রা শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে শপথ নেয় সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একের পর এক করা আন্দোলন মোকাবিলা করতে হয়েছে সরকারকে। ছয় মাসে প্রায় ১৪০টি আন্দোলন হয়েছে নানা দাবিতে। আন্দোলনকারীদের অনেক দাবি পূরণ হয়েছে। কেউ কেউ এখনো আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে শুরুতে সব পক্ষ থেকেই ঐক্য ধরে রাখার কথা বলা হলেও সরকারের যাত্রা শুরুর সময় যে ঐকমত্য বা আস্থার জায়গা ছিল, সেটা কতটা ধরে রাখা সম্ভব হবে তা এখন একটা বড় প্রশ্ন। কয়েকটি দল ভোটের জন্য সরকারকে চাপ দিলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিপরীত অবস্থানে। একই অবস্থানে রয়েছে জামায়াতসহ অন্যান্য কিছু ইসলামি দল। এমনকি পতিত আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া নিয়েও রয়েছে মতভেদ।
এদিকে ক্ষমতা গ্রহণের পর ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ গঠন করে নিহতদের পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থার কথা বলেছিল সরকার। কিন্তু আন্দোলনে নিহত বা শহীদদের স্বীকৃতি ও সহায়তা এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি যথাযথভাবে হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। ছয় মাস পর এখনো সুচিকিৎসার দাবিতে আহতদের বিক্ষোভ চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পণ্যের ওপর ভ্যাট বসানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা রয়েছে। তাছাড়া আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের) কাছ থেকে নতুন করে ঋণ চাওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে এমন নানা সিদ্ধান্তের কারণে অনেকেই বলছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের নীতি অনুসরণ করছে।
দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ৬ মাস পরও অন্তর্বর্তী সরকার জনজীবনে স্বস্তি আনতে পারেনি বলে মূল্যায়ন করেছে সিপিডি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন স্বৈরাচারী সরকারের ভুল নীতিকে এজন্য দায়ী করেছে গবেষণা সংস্থাটি।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ : দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে না রাখতে পারায় আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি মানুষের বড় ধরনের ক্ষোভ জন্মেছিল। আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল, বাজারে পণ্যের দাম কমবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
বর্তমান সরকার সুদের হার বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে টাকা না ছাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে সেটার প্রভাব খুব একটা দেখা যায়নি। এমনকি তেল, চিনিসহ আমদানি করা নিত্যপণ্যের শুল্কহার কমিয়েও দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারছে না সরকার।
জিনিসপত্রের দাম কমাতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। চাঁদাবাজি, মজুদদারি, অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের মতো অনিয়ম মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি বলে সরকার জিনিসপত্রের দাম কমাতে পারছে না বলে মনে করেন সিপিডির গবেষকরা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এ সরকার। বিশেষ করে মাঠে পুলিশের অনুপস্থিতি ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ প্রবণতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। একের পর এক ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকান্ডের ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সরকারের আন্তরিকতায় সে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি এখনো।
আবার এটাও বাস্তবতা যে, ৫ আগস্টের পর হামলার শিকার পুলিশ ফাঁড়ি ও থানাগুলোর সবকটি এখনো পুরোপুরি গুছিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ছাত্র আন্দোলন দমনে নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে পুলিশ বাহিনী যে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছিল, সেটিও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। প্রতিশোধের ভয়ে পুলিশ পুরোপুরি তাদের কাজে ফেরেনি।
এমন অবস্থায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত বছর সেপ্টেম্বরে সেনাবাহিনীকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামায় নতুন সরকার। তবে জনমনে আতঙ্ক রয়েই গেছে।
অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য : অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং রিজার্ভ ঠিক রাখা, বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ এমন অনেক কিছুই সামাল দেওয়া। অর্থনীতি বা ব্যাংকিং ব্যবস্থা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও মানুষের ওপর চাপ কমছে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন ‘এখনো পর্যন্ত জনগণের জীবনে কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গনে স্বস্তি আনার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।’
তবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরেছে, থেমেছে রিজার্ভে পতন। কিন্তু দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া। শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়ায় উৎপাদন খাতেও স্থবিরতা চলছে।
সিপিডি বলেছে, জুলাই আন্দোলনের মূল কারণ ছিল কর্মসংস্থানের অভাব। বিগত সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছিল। সমাজে বৈষম্য বেড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারেনি।
নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার: দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের পক্ষ থেকে যে বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা গেছে, সেটি হলো রাষ্ট্র সংস্কার। গণঅভ্যুত্থানের এক মাসের মাথায় সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন ও জনপ্রশাসন সংস্কারে ছয়টি আলাদা কমিশন গঠন করে সরকার। পরবর্তী সময়ে এ তালিকায় যুক্ত হয় আরও পাঁচটি কমিশন।
ইতিমধ্যে প্রথম দফায় গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে। এ মাসের মাঝামাঝি এ সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দল ও গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করার কথা রয়েছে সরকারের।
সংস্কার কতটুকু করতে হবে তার ওপর নির্ভর করে ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করার কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকেও কেউ কেউ সংস্কার প্রক্রিয়ায় ধীরগতির অভিযোগ তুলেছে। আবার বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দলকে দ্রুত সংস্কার শেষ ও নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার দাবিও তুলতে দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, নির্বাচনে দেরি হলে এ সরকার বিতর্কিত হবে। বিএনপি মনে করে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে দেড় দশক কর্র্তৃত্ব করা বিগত সরকারের ‘দোসরদের ষড়যন্ত্র’। নির্বাচনে যত দেরি হবে, এমন সমস্যা তত বাড়বে।
সরকারের সঙ্গে বিভেদ, দূরত্ব: ছয় মাসের সময়কালেই নানা ধরনের রাজনৈতিক বিভাজন, দ্বন্দ্ব আর অবিশ্বাসের জায়গা দেখা যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার ঘিরে। ‘কিংস পার্টি’ বিতর্কে সরকারের ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ দুজনই বলেছেন, রাজনীতি করলে তারা সরকারি পদ থেকে বের হয়ে যাবেন।
তাতে করে বিএনপি থেমে যায়নি। দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে ক্রমাগত বলা হচ্ছে নতুন দলকে তারা স্বাগত জানাবেন, কিন্তু সরকারে থেকে দল গঠন হলে সেটা জনগণ মেনে নেবে না। আবার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখা গেছে সরকারকে ঘিরে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের জন্য ঐকমত্যের জায়গা সৃষ্টি করাটাই এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ।