খাদ্যের মূল উৎস উদ্ভিদ। দেহাভ্যন্তরে জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া সচল রাখার প্রয়োজনীয় উপাদান পাই উদ্ভিদ থেকেই। এটি সু-স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষম থাকার জন্য অপরিহার্য। যত বেশি বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ থেকে খাদ্য গ্রহণ করা হয়, স্বাস্থ্য তত বেশি সুরক্ষিত থাকে। পৃথিবীতে খাদ্যোপযোগী এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার প্রজাতি চিহ্নিত করা গেছে। এদের মধ্যে খাদ্য চাহিদা মেটাতে ৭ হাজার প্রজাতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবহার রয়েছে। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে মাত্র ১৫০টি প্রজাতির ব্যবহার হচ্ছে। আবার এদের মধ্যে মাত্র ১০৩টি ফসল ৯০ ভাগ শক্তির জন্য খাদ্য তালিকায় রয়েছে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, মাত্র ৪টি ফসল (ধান, গম, ভুট্টা ও আলু) ৬০ ভাগ শক্তির সরবরাহক। বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র আয়তনের দেশে ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-প্রকৃতির ধরন, অনুকূল জলবায়ু ও পরিবেশে ৫শ’র বেশি প্রজাতির উদ্ভিদের উপস্থিতি দেখা যায়। এসব উদ্ভিদের হাজার হাজার ভূ-কুল (ল্যান্ডরেস) দেশের জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর খাদ্য হলো, ঐ অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে বিকশিত উদ্ভিদকুল থেকে উৎপন্ন খাবার। যার আরেক নাম ‘ইকোলজিক্যাল ফুড’ । সবুজ বিপ্লবের আগেও দেশের মানুষ খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য দেশীয় নানাবিধ উদ্ভিদ প্রজাতির বৈচিত্র্যময় ভূ-কুল ছিল অন্যতম পুষ্টির উৎস। বর্তমান উৎপাদনশীলতার মানদ-ে এ সমস্ত ভূ-কুলের ফলনশীলতা কম। ফলে খাদ্যাভাবজনিত রাজনৈতিক চাপ প্রশমনে দেশের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীর খাদ্য-প্রাপ্যতা বাড়াতে সবুজ বিপ্লবকে দ্রুততম সময়ে কৃষিনীতি গ্রহণ করতে হয়েছে। সবুজ বিপ্লব খাদ্য উৎপাদন তথা দানাদার ফসলের প্রাপ্যতা বাড়িয়ে উদরপূর্তি করতে সহায়তা করেছে, কিন্তু বৈচিত্র্যময় পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা কমিয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। বর্তমানে দেশে হাতেগোনা কয়েকটি উদ্ভিদ প্রজাতির মুষ্টিমেয় আধুনিক জাত মানুষ ব্যবহার করছে, যেখানে ৭৫-৮০ ভাগ শক্তির জোগানদাতা ধান, আর পাশাপাশি ২০-২৫টি প্রজাতি খাদ্য তালিকায় অবদান রাখছে। বাকি শত শত প্রজাতি ও তাদের হাজার হাজার ভূ-কুল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে খাদ্য তালিকা বহির্ভূত থেকে যাচ্ছে। চাষযোগ্য এবং খাদ্যোপযোগী উদ্ভিদ হওয়া সত্ত্বেও, এরা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার না হয়ে অনাদৃত থেকে যাচ্ছে।
ফসলকে প্রধান ও অপ্রধান দুভাগে ভাগ করা হয়, অনাদৃতদের প্রায় সবই অপ্রধানদের দলে। এমনকি দেশে প্রধান খাবার ধানের প্রায় ৪ হাজার ভূ-কুল ছিল, বিগত চার দশকে এ ভূ-কুলগুলো মাঠ থেকে জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। অথচ এরা পুষ্টিগুণ ও মানে অতুলনীয় খাদ্য তালিকায় এক সময় সমাদৃত ছিল। বিগত দশকে ভোক্তার জীবনধারা পরিবর্তন হয়েছে এবং খাদ্য সংস্কৃতিও বদলেছে, সে সুবাদে সমাদৃত উদ্ভিদগুলোর আর তেমন চাহিদা নেই বা হয়তো স্বল্প পরিসরে দেখা যায়। আবার এমন অনেক প্রজাতি আছে যা প্রাকৃতিকভাবেই বংশরক্ষা করে এবং কোনো প্রকার চাষ হয় না অর্থাৎ অচাষিত (আনকালটিভেটেড)। এই অচাষিতদের বুনো বা ওয়াইল্ড এবং আধা-পালিত হিসেবে বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তার ধারে, বন-জঙ্গলে, ফসলি ক্ষেতের আইলে, পাহাড়ে, জলাভূমিতে, শুষ্কাঞ্চলে, লবণাক্ত জমিতে, চরাঞ্চলে, এমনকি ফসলি জমিতে দেখা যায়। বাঙালির খাবার কী ছিল প্রাচীন সাহিত্য, পুঁথিপত্র থেকে বেশ কিছু পুরনো উদ্ভিদের ব্যবহারের কথা জানা যায় যেমন মিষ্টিআলু, মেটেআলু, শাপলা, শালুক, ভেট, কেউরালি, বেগুন, কুমড়া, কাঁচকলা, কাঁঠাল-বিচি, নলিতা শাক (পাট শাক), বথুয়া, ঢেঁকিশাক, লাউ, হেলেঞ্চা, তেঁতুল, বিলিম্বি, চালতা, শাকনটে, কাঁটানটে, ফলসা, কদবেল, বেল, গীমাইশাক, চটাশাক, হিং, জিরা মেথি, রস-বাস (এলাচি-লবঙ্গ), মুগ, অড়হর, কলাই, বাটুলা ডাল, ইসবগুল, আরও কত কি। এদের বেশিরভাগ এতিমদের দলে। এই এতিম উদ্ভিদগুলো ছিল অবস্থাপন্নদেরও খাবারের অংশ।
কালের যাত্রায় মানুষ শহুরে হয়েছে, অতিব্যস্ততায় খাদ্য তালিকা ছোট হয়েছে, সে হাওয়া গ্রামে-গঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে পশ্চিমা খাবারের প্রাদুর্ভাব। বিশ্বায়ন, অতিমাত্রায় শহরায়ন ও সবুজ বিপ্লব, এতিম ফসলগুলোকে আরও অন্ত্যজ শ্রেণির খাবারে পরিণত করেছে। তবে এখনো কিছু উদ্ভিদ ভূ-কুল আছে, তারা সমানভাবে অনেক মানুষের কাছে জনপ্রিয়, যেমন হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের একটি বিশেষায়িত এলাকা, সেখানে তত্ত্বতালাশ করে দেখা গেছে বিভিন্ন মৌসুমে প্রায় ৮-১০টি অনাদৃত ও অচাষিত উদ্ভিদ খুবই জনপ্রিয়। তন্মধ্যে বর্ষা মৌসুমে কেউরালি ও শাপলার ডগা সুপ্রিয়, মাছ কিংবা শুঁটকি কখনো কোনো কিছু ছাড়া এ দুটো দিয়ে অনেক ধরনের সুস্বাদু তরকারি হয়। যা ধনী-দরিদ্র সবার কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। ভোক্তাদের অনেকেই এদের ঔষধিগুণও জানেন। যেমন, গিমাই শাক শোধক হিসেবে খ্যাত, কেউরালি ও শাপলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে; আবার আয়রন ও আয়োডিনের সস্তা উৎস। হাওর বা জলমগ্ন অঞ্চলে শালুক ও পানিফল একটি সুস্বাদু ও উচ্চ পুষ্টির খাবার, সকালে খেলে সারা দিন ক্ষুধা লাগে না। পুষ্টিবিদরা বলছেন, শালুক ও পানিফলের স্টার্চ খুবই মানসম্মত, ধীরে ধীরে ভাঙে এবং ক্ষতিকর গ্লুটেন মুক্ত। বাংলাদেশের পাহাড় অনাদৃত ও অচাষিত উদ্ভিদের আধার, পাহাড়িদের খাদ্যাভ্যাসে এখনো অনেক উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে তিত বেগুন, বাঁশকুরল, তারা, ফুজি, সাবরাং, জম্মু কচু, নারিকেলি কচু, পিলা আলু, রাম আলু, মাত্তুশাক অতি জনপ্রিয় ও তুলনামূলকভাবে দামি। পাহাড়িদের মতে এরা কেউ শক্তির খাবার, জন্ডিস সারায়, কেউ খাদ্যের স্বাদ বাড়ায়, আবার কেউ বসন্ত রোগের প্রতিষেধক। যা হাজার বছর ধরে জনমুখের জ্ঞান হিসেবে বিবেচিত। তবে এগুলোতে মানবদেহের জন্য অতিমূল্যবান ফাইটোকেমিক্যাল আছে তা তো পরীক্ষিত।
তথাকথিত আধুনিক শ্রেণির কাছে দেশীয় ফসলের তৈরি খাবার তুচ্ছ, কিন্তু পশ্চিমাদের প্রক্রিয়াকৃত খাবারই পুষ্টিকর ও সভ্যতার বাহক, স্থানীয় খাবার হলো দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি, অতএব পরিত্যাজ্য। কিছু উদাহরণ দিলে তা স্পষ্ট করা যাবে। যেমন, লাল চালের পুষ্টিগুণ সাদার চেয়ে ভালো অথচ সাদা চাল জনপ্রিয়, আবার দেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল আধুনিক ভোক্তার কাছে কি খুব আদৃত? হলফ করে বলা যায় বেশিরভাগ ভোক্তাই উত্তর দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হবেন। দেশে মৌসুমে কত কাঁঠাল যে নষ্ট হয়, তার হিসাব নেই। মিষ্টিআলু ভালো মানের আঁশযুক্ত অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার। দেশে কয়জন মিষ্টি আলু খান বা পছন্দ করেন? অথচ উন্নত দেশ জাপানে মিষ্টি আলু দামি খাবার। আবার স্থানীয় সবজিগুলোর অবস্থাই ধরা যাক। বাজারে একই দোকানে ফুলকপি, বাঁধাকপি থাকলে কেউ কখনো বথুয়া শাক, শাকনটে, ঢেঁকিশাক, কেউরালি, শাপলা, হেলেঞ্চা কিনতে উৎসাহবোধ করেন না। দেশে ফসকা বেগুন আগাছা নামে পরিচিত। অথচ ইউরোপে তা অতিদামি খাবার। শালুক দেখলে মনে করে দুর্ভিক্ষের প্রতিচ্ছবি, প্রত্যাখ্যানই উত্তম পন্থা। যাহোক দেশে শুধুমাত্র অনাদৃত ১১টি দানাদার, ৪০টি ফল, ৪টি ডাল, ৩টি তেল, ৭৯টি সবজি, ১৫টি মসলা, ২৫টি মূল বা কন্দাল জাতীয় ফসল চিহ্নিত করা গেছে, আর অচাষিত যোগ করে এদের অন্ত ও আন্তঃপ্রজাতি ভূ-কুল মিলে এ সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এ সমস্ত ফসলের পুষ্টিগুণ চাষকৃত ফসলের চেয়ে অনেক বেশি ও বৈচিত্র্যময়।
নীতিনির্ধারণী মহলের নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশের পুষ্টি পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়, পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের সামগ্রিক জীবনমানকে উন্নত করতে হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এতিম ফসল একটা সুন্দর সমাধান তৈরি করতে পারে। এটা অনাকাক্সিক্ষত যে এদের আমরা খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সফল নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারিনি। এক্ষেত্রে সিভিল সোসাইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশে এতিম উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা তেমন নেই। ফসলসমূহের পুষ্টি পরিমাপ তথ্য ও তাদের ঔষধিগুণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা জরুরি। তথ্যাবেগের চেয়ে , ফলাফলভিত্তিক তথ্যের প্রতি আধুনিক মানুষ বেশি সংবেদনশীল। তাই উদ্ভিদসমূহের সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা-উপাত্ত খুবই প্রয়োজন। এর ফলে উদ্ভিদগুলোর বাণিজ্যিক মূল্য বাড়বে। তার একটা সাক্ষাৎ উদাহরণ হলো শজিনা। মাত্র কয়েকটি ল্যাবরেটরির ফলাফলে অনাদৃত উদ্ভিদটিকে অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছে। শজিনার মূল্য সংযোজিত অবস্থায় পৃথিবীতে ১০ বিলিয়ন ডলারের বাজার আছে, ২০৩০ সালে তা ২০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। আমাদের দেশের ১৫ ধরনের কুমড়া জাতীয় উদ্ভিদ দেখা যায়, তার মাত্র ৩-৪টি বাণিজ্যিক চাষ হয়, বাকিগুলো প্রায়ই অনাদৃত, ৩৫-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অন্য ফসল যেখানে টিকে থাকতে পারে না, সে সময় এরা তখনো ফল ধারণ করতে পারে। আবার যেহেতু এরা পিট ফসল ও লতানো উদ্ভিদ, শুধুমাত্র পিট ব্যবস্থাপনা করেই খরা, লবণ, জলাবদ্ধতা মোকাবিলা করা যায়।
বৈশ্বিকভাবে পুষ্টি ও জলবায় মোকাবিলায় দুটো ধারা সচল আছে। একটি শুধুমাত্র জিন প্রযুক্তির বিকাশ করে পরিস্থিতি সামলানো এবং দু-পয়সা কামানো। অন্যটি স্থায়িত্বশীল কৃষিখাদ্যের বিকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা, যারা জীববৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে চান। দেশে শক্তি প্রদানকারী খাদ্যের তেমন অভাব নেই। কিন্তু পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব রয়েছে। সে জন্য নানামুখী উদ্যোগ জরুরি। এ ব্যাপারে সিভিল সোসাইটি সরকারের সঙ্গে ব্যাপক কাজ করতে পারে। আমাদের বসতবাড়ি, অধুনা ছাদ বাগানে প্রচলিত বাণিজ্যিক ফসলের চাষ না করে, নব নব উদ্ভাবনী দিয়ে এ সমস্ত অনাদৃত ও অচাষিত তথা এতিম উদ্ভিদ চাষ করে ভোক্তা তার খাদ্য-বৈচিত্র্য বাড়াতে পারে। এমনকি এগুলো শুকিয়ে আধুনিক মোড়কে বাজারজাত করে সহজেই পরিবারের আয় বৃদ্ধি করা যায়। এটা খুবই অপ্রত্যাশিত যে, এগুলো ব্যবহার ও সংরক্ষণে দেশের নীতি-সহায়তার অভাব রয়েছে। এটি দূর করা জরুরি।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক
nazim.68@gmail.com