দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো যত দ্রুত সম্ভব এক শিফটের স্কুলে পরিণত করার পাশাপাশি বাংলা ও গণিতে শিশু শিক্ষার্থীদের শক্ত ভিত তৈরিতে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭৫ মিনিটের ক্লাস চালুর সুপারিশ করেছে প্রাথমিক এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কার কমিটি।
এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক পদ বিলুপ্ত করে প্রবেশন পর্যায়ে ‘শিক্ষক’ পদে ১২তম গ্রেডে বেতন দেওয়া, প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে এবং পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগসহ প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৪টি সুপারিশ করা হয়েছে কমিটির পক্ষ থেকে।
বর্তমানে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ত্রয়োদশ গ্রেডে ও প্রধান শিক্ষকরা একাদশ গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন।
গতকাল সোমবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ সুপারিশের প্রতিবেদন জমা দেয় পরামর্শক কমিটি। পরে বিকেল ৫টায় এ নিয়ে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
গত অক্টোবরে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কারে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদকে আহ্বায়ক করে পরামর্শক কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটিতে একজন সদস্য সচিব ও সাতজন সদস্য ছিলেন।
ব্রিফিংয়ে মনজুর আহমেদ বলেন, শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের শিক্ষাকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা, পদোন্নতি ও পেশাগত অগ্রগতির ব্যাপারে নির্দিষ্ট ও দ্রুত পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুসারে ‘সহকারী শিক্ষক’ পদবি বিলুপ্ত হবে, ‘শিক্ষক’ হিসেবে কর্মজীবনের সূচনার পর ‘সিনিয়র শিক্ষক’ হিসেবে পরবর্তী পদোন্নতি হবে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে প্রাথমিক শিক্ষকসহ বিদ্যালয় শিক্ষকদের স্বতন্ত্র মর্যাদা ও উচ্চতর বেতন কাঠামো বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রচলিত কাঠামো তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে পদায়নের দাবি উচ্চ আদালতে সমর্থন পেয়েছে; কিন্তু সরকার এ নিয়ে রিভিউ আবেদন করেছে। সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষকদের স্বতন্ত্র মর্যাদা ও উচ্চতর বেতন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত কমিটির অন্তর্বর্তী সুপারিশ হলো, শিক্ষক পদে প্রবেশ দ্বাদশ গ্রেডে, দুই বছর পর স্থায়ীকরণ, আরও দুই বছর পর ১১তম গ্রেডে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি।
‘প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে সুপারিশ হলো, সরকারের রিভিউ আবেদন প্রত্যাহার ও প্রধান শিক্ষকের জন্য দশম গ্রেড নির্ধারণ এবং সব প্রধান শিক্ষক পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ।’
সেখানে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ বৃদ্ধি এবং সিনিয়র শিক্ষকদের মধ্য থেকে দায়িত্বভাতাসহ পদায়নের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সুপারিশে শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষক নিয়মানুসারে উচ্চতর স্কেল পাওয়ার যোগ্য বলে মত দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে পদোন্নতিযোগ্য পদগুলো ও শূন্যপদ পূরণ, সমন্বিত গ্রেডেশন, পারস্পরিক বদলি, আঞ্চলিক অফিস স্থাপন এবং প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিস বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে সংস্কারের জন্য গঠিত এ পরামর্শক কমিটির পক্ষ থেকে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রমে (পিইডিপিএস) অন্তত ৫০ শতাংশ বিদ্যালয়ে এবং ১০ বছরের মধ্যে সব বিদ্যালয়ে এক শিফট চালু করা যেতে পারে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত অনূর্ধ্ব ১:৩০, অর্থাৎ প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক নিশ্চিত করা দরকার।
প্রধান আটটি বিষয় চিহ্নিত করে সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানান মনজুর আহমেদ। এগুলো হলো শিক্ষণ-শিখন ও শিক্ষার্থী মূল্যায়ন; শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী; অভিগম্যতা, অন্তর্ভুক্তি ও বৈষম্য নিরসন; প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও শিশুর বিকাশ; উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু; শিক্ষা শাসন ও ব্যবস্থাপনা; ক্ষেত্রনির্বিশেষে ক্রস-কাটিং বিষয় এবং সংস্কার বাস্তবায়ন, অর্থায়ন ও পরবর্তী পদক্ষেপ।
সুপারিশে বলা হয়েছে, দরিদ্র পরিবারের ব্যয় লাঘব করতে যত দ্রুত সম্ভব মিড ডে মিল প্রবর্তন, খাতা-কলম-ব্যাগ ইত্যাদি সামগ্রী বিতরণ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্ধারিত অতিদরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য বর্ধিত হারে অর্থ সাহায্য দেওয়া যেতে পারে।
দুর্নীতি, অসদাচরণ ও কর্তব্যে অবহেলা নিরোধের লক্ষ্যে একটি অন্যতম সুপারিশ হলো, অভিযোগ জানানোর জন্য দেশব্যাপী হটলাইন স্থাপন করা যেতে পারে। সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে এসব তথ্য নিয়মিত সময়ান্তরে জনসমক্ষে প্রকাশ করা যেতে পারে।
শিক্ষা শাসন ও ব্যবস্থাপনার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে দেশের ১০ জেলার ২০টি উপজেলায় পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় পাইলট প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে বলে পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
বিভিন্নভাবে সুযোগবঞ্চিত শ্রমজীবী, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগের সুপারিশ করা হয়েছে। জেন্ডার ন্যায্যতা ও জলবায়ু অভিঘাত বিষয়ে এবং দুর্গম এলাকার শিশু ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধিতে নির্দিষ্ট পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে কমিটি।
শিক্ষকদের প্রি-সার্ভিস শিক্ষা ও যোগ্যতা অর্জন এবং শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিরন্তর পেশাগত উন্নয়নের পাশাপাশি সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত মানসম্মত বিদ্যালয় শিক্ষার খাত পরিকল্পনা এবং স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয় সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ব্রিফিংয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে আমাদের কথা শুনেছেন। তিনি বলেছেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু কম আলোচিত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘কমিটি যে সুপারিশ করেছে, তা মানার নৈতিক দায় আমাদের আছে, কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। এজন্য সরকারকেও নীতিগত সিদ্ধান্তের দরকার। শিক্ষকদের মানোন্নয়নের বিষয়ে কমিটির সুপারিশ শিক্ষকরা মেনে নিলে সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।’
সুপারিশ প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়, শিক্ষা সংস্কারের জন্য কোনো সহজ জাদু সমাধান নেই। প্রস্তাবিত সুপারিশ নিয়ে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সময়াবদ্ধ সমন্বিত বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রম ও সরকারের বার্ষিক বাজেট হবে সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রধান বাহন।