জাতীয় ঐকমত্য হবে?

ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো স্বৈরাচার পতনের দাবিতে যে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল বিভিন্ন বাস্তবতায় সেখানেও বিভিন্ন সন্দেহ দানা বাঁধছে। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিশন দেশবাসীর মনে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে। শনিবার বিকেলে ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ সার্থক করতে ও তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবাই মিলে সব ধরনের চেষ্টা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোকেই করতে হবে, কমিশন ও সরকার সহযোগিতা দেবে। অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়েছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ২৬টি দল ও জোটের প্রায় ১০০ নেতা অংশ নেন। তবে আওয়ামী লীগের জোটে থাকা কোনো দল ও জাতীয় পার্টিকে বৈঠকে ডাকা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় পর্বেও হাঙ্গামা হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘যাদের (ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার) বাংলাদেশের মানুষ তাড়িয়ে দিয়েছে, অস্বীকার করেছে, ত্যাগ করেছে, তারা ফিরে আসার জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল। প্রতিটি দিন তাদের জন্য মূল্যবান দিন। দেরি হলে তাদের জন্য অসুবিধা। সেজন্য আমাদের শক্ত থাকতে হবে, মজবুত থাকতে হবে।’ এর আগে ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে এবং এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণও অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। সংস্কার কমিশনগুলোর দেওয়া প্রতিবেদনগুলো নিয়ে দ্রুততম সময়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ-আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সংস্কারে ঐকমত্য শেষে অতিদ্রুত নির্বাচনের আশা করছে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল। অবশ্য কিছু রাজনৈতিক দল বলছে, আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার তার পরে নির্বাচন। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কিছুটা দ্বিমত রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাই ছিল স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোও মনে করে রাষ্ট্রকাঠামোকে গণতান্ত্রিক রূপ দিতে যেসব বাধা আছে, সেগুলোও দূর করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সংস্কার প্রস্তাবে সব রাজনৈতিক দলই সমর্থন জানিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনের বিষয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি রূপরেখা তৈরি করা। সে ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে অর্থবহ সংলাপের একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা। রাজনৈতিক দলগুলোকেই মোটাদাগে কতগুলো বিষয়ে একমত হতে হবে। কোনো দলের এমন অবস্থান নেওয়া ঠিক হবে না, যাতে পুরো উদ্যোগই ভেস্তে যায়। অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, আত্মবিশ্বাস তৈরি এবং প্রকৃত সংস্কার কার্যকর করার একমাত্র পথ। নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় নয়, এটি আবশ্যক অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য। প্রশ্ন হলো নির্বাচনটি কবে হবে? জাতীয় না স্থানীয়কোন নির্বাচন অগ্রাধিকার পাবে? অন্তর্বর্তী সরকার ডিসেম্বরকে ডেটলাইন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন ও সংস্কারের বিষয়টি রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের ঐকমত্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে কোনো বিষয়েই একমত হতে পারে না, সেখানে নির্বাচনের দিনক্ষণ কিংবা সংস্কারের পরিধি নিয়ে একমত হতে পারবে কি না সেই প্রশ্নও আছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাফল্য অনেকটা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলের ওপর। তারা একমত হলে নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে না।

মনে রাখতে হবে, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের ভোটের মাধ্যমে আসেনি; বরং তিনটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় জনমনে যে ক্ষোভ ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে। আর এই সরকার হলো সেই অভ্যুত্থানের ফসল। নির্বাচন আগে না সংস্কার আগে রাজনৈতিক মহলে যে বিতর্ক আছে, সেটা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করি। আশা করা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হলে এর অবসান হবে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর জনমনে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটা পূরণ করার দায়িত্ব যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের, তেমনি আন্দোলনের অংশীজনদেরও।