তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে আজ সোমবার থেকে শুরু হওয়া অবস্থান কর্মসূচির জন্য যখন দেশের উত্তরের পাঁচ জেলার মানুষ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই গতকাল রবিবার উজানের আকস্মিক ঢলে পানি বেড়েছে তিস্তায়। শুকনো বালুচরে বইতে শুরু করা এ পানির প্রবাহ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়রা বলছেন, শনিবার দুপুরে হঠাৎ করে ভারত তাদের গোজলডোবা ব্যারাজ থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ায় ডালিয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্পের তিস্তা ব্যারাজ এলাকাসহ আশপাশের ২২টি চরে পানি বাড়তে থাকে।
তিস্তায় পানি কিছুটা বাড়ার তথ্য দিয়ে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেছেন, হঠাৎ এ পানি বাড়ায় বড় কোনো ক্ষতি হবে না। এ ছাড়া তিস্তা ব্যারাজের জলকপাট বন্ধ রাখা হয়েছে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য। তবে পানি বাড়ায় চরের জমিতে মৌসুমের বিভিন্ন ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন চরবাসীরা। তারা বলছেন, সচরাচর এ সময় উজানের ঢল আসার কথা নয়। কিন্তু গত শনিবার দুপুরের পর পানি বাড়তে থাকে। সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত হু-হু করে উজানের ঢল আসতে থাকে। হঠাৎ পানি বাড়ায় চরবাসীরা তাদের চরের জমির ফসলের ক্ষতির আশঙ্কার কথা জানালেও উজানের এ ঢল চলতি বোরো আবাদে তিস্তা সেচে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বলে মনে করছেন অনেক কৃষক।
অবিলম্বে তিস্তা নদীর পানি চুক্তি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তরাঞ্চলের তিস্তাপাড়ে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ সেøাগানে আজ দুপুর থেকে ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা। দুদিনের এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি। যার প্রধান সমন্বয়ক বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলু। তিস্তা নদীর পানি নিয়ে বৈষম্যের বিষয়টি বিশ্ববাসীকে জানাতে তিস্তাপাড়ের ১১টি পয়েন্টে ২০ লাখ মানুষের সমাগম ঘটবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। এ কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সশরীরে উপস্থিত থাকবেন আর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও কলে যুক্ত থাকবেন।
স্থানীয় অনেকে বলছেন, এ আন্দোলন দেশের পানিসম্পদ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে নদীতীরে বসবাসকারী কৃষকরা প্রতি বছর একইভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন। অবস্থান কর্মসূচি আজ দুপুর ২টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হবে। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিকেল ৪টায় কর্মসূচির উদ্ধোধন করার কথা রয়েছে। এ সময় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখবেন। এর আগে দুপুর ২টা ১০ মিনিটে দাবি উপস্থাপনসহ বক্তব্য দেবেন তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবীব দুলু। এ ছাড়া নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তিনজন বক্তব্য দেবেন।
আয়োজকরা জানান, প্রথম দিনের কর্মসূচিতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, পালা গান, ভাওয়াইয়া গান, ঘুড়ি ওড়ানো এবং হা-ডু-ডু খেলাসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি চলবে রাত ২টা পর্যন্ত। কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় লালমনিরহাটের তিস্তা সেতু থেকে রংপুরের কাউনিয়া পর্যন্ত গণপদযাত্রা এবং তিস্তা নদীতে নেমে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হরে। এরপর বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পীর অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। পরে সন্ধ্যা ৭টায় লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওইদিন নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। এরপর রাত ৮টায় বেবী নাজনীন সংগীত পরিবেশনা করবেন এবং তিস্তাপাড়ের জীবনমান নিয়ে তৈরি সিনেমা ‘সাঁতাও’ প্রদর্শনের মাধ্যমে রাত ১২টায় দুদিনের কর্মসুচি শেষ হবে।
এদিকে গতকাল দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, উজান থেকে আসা পানির চাপ এতটাই বেড়েছে যে, বন্ধ থাকা জলকপাট উপচে পানি পড়ছে। এক নম্বর জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। যেখানে শনিবার সকালেও ধু-ধু বালুচর দেখা যাচ্ছিল। সেখানে ওইদিন বিকেল থেকে বইছে পানি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতের পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে এ সময় পানি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে তিস্তা আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হয়। যখনই তারা পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য আন্দোলনে নামেন তখনই ভারত আকস্মিকভাবে পানি ছেড়ে দিয়ে পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করে। ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কৃষক আবদুল আজিজ বলেন, ‘ভারত জানে এবারের আন্দোলন ঐতিহাসিক হতে যাচ্ছে। তাই তারা পানি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছে।’ হাতীবান্ধার কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, ‘এ সমাবেশ ঘিরে সব দলমত নির্বিশেষে এক হয়েছে। ভারত পানি ছেড়ে আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা পিছু হটব না।’
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝাড়শিঙ্গেশ্বর চরের বাসিন্দা আলী উদ্দিন (৬৫) জানান, হঠাৎ তিস্তায় ঢল নেমে চরের ফসলি জমিতে পানি ঢোকে। এতে চরের জমিতে থাকা বোরো, গম, আলু, মরিচ, বাদাম পেঁয়াজ, রসুন, তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
ডিমলার চরখড়িবাড়ি গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেন (৫০) বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে এমন ঢল তিস্তায় এর আগে দেখিনি।’