হাইকোর্টের রায়ে নিয়োগ বাতিল হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নির্বাচিতদের নিয়োগের দাবিতে মহাসমাবেশ করেছেন শিক্ষকরা। গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মহাসমাবেশ শুরু করলেও বিকেল ৪টার দিকে তারা সচিবালয়ের দিকে যাত্রা করলে শিক্ষা ভবনের সামনে সচিবালয়মুখী সড়কে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জল কামান, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে। পরে আন্দোলনকারীদের ‘ভয় দেখাতে’ চার-পাঁচজনকে আটকের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকদের সামনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, ‘যাদের আমরা ধরেছি, তাদের গ্রেপ্তার বলব না। তাদের আমরা আপাতত আটক করে রেখেছি, যেন অন্যরা ভয়ে চলে যান। পরে তাদের ছেড়ে দেব। তারা এখনো ছাত্র, ভবিষ্যতে শিক্ষক হবেন, তাদের বিরুদ্ধে আমরা মামলা দিতে চাই না। এখন পর্যন্ত চার-পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।’
গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষা ভবনের সামনে সচিবালয়মুখী সড়কে এ ঘটনা ঘটে। পরে নারী আন্দোলনকারীদের সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান নিয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ সেøাগান দেন।
এর আগে বেলা ১১টায় শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর মোড়ে জড়ো হতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তাদের পূর্বঘোষিত মহাসমাবেশ শুরু হয়। বেলা ৩টার দিকে তারা শাহবাগ থেকে পদযাত্রা শুরু করেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা শিক্ষা ভবন এলাকায় গেলে জল কামান দিয়ে পানি ছিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। এ সময় পুরুষ আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটাও করে পুলিশ। এতে তারা সেখান থেকে সরে গেলেও রাস্তায় বসে বেশ কিছুক্ষণ বিক্ষোভ করেন নারী আন্দোলনকারীরা। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে বেশ কয়েকজনকে আটক করলে রাস্তা থেকে সরে যান আন্দোলনকারীরা।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে তৃতীয় ধাপে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ ৬ হাজার ৫৩১ জনের নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করে রায় দেয় হাইকোর্ট। তাৎক্ষণিক তারা হাইকোর্টে এর প্রতিবাদ জানান। এরপর থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছেন তারা।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৩ সালের বিজ্ঞপ্তি তিনটি ধাপে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের চূড়ান্ত নিয়োগ কার্যক্রম এবং অপেক্ষমাণ তালিকা থেকেও নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় ধাপের চূড়ান্ত নিয়োগ নিয়ে টালবাহানা চলছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের প্রার্থীদের নিয়োগ শেষে যোগদান করানো হয়েছে। তৃতীয় ধাপে এসে নতুন নিয়মের দোহাই দিয়ে আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।’
জানা যায়, সহকারী শিক্ষক পদে তৃতীয় ধাপে চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা অনুসরণ করার অভিযোগে উত্তীর্ণদের ফলাফল প্রকাশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে নিয়োগবঞ্চিত ৩০ প্রার্থী হাইকোর্টে রিট করেন। রিটের শুনানি নিয়ে গত বছরের ১৯ নভেম্বর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেয়।
আদালত তার আদেশে এ নিয়োগের কার্যক্রম ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে। এ ছাড়া রুলে ৩১ অক্টোবর ফলাফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ও নিয়োগ বিষয়ে ১১ নভেম্বরের নির্দেশনা-সংবলিত স্মারক কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। সেই রুলের শুনানি শেষে ৬ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করা হয়।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা সকাল থেকে শাহবাগে ছিলেন। সেখান থেকে দুপুরের পর হঠাৎ তারা প্রেস ক্লাবের সামনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিয়োগ নিয়ে হাইকোর্টের রায় তাদের বিপক্ষে গিয়েছিল। আজকে (গতকাল) একটি রায় হওয়ার কথা ছিল, সেটা তারা জানেন। পরে রায়টি আর হয়নি। কয়েক দিন পর হয়তো হবে। এ বিষয়টা তারাও খুব ভালোভাবেই জানেন। কিন্তু তারা ইচ্ছা করে আমাদের বলছেন, আমরা প্রেস ক্লাবে যাব। প্রেস ক্লাবের কথা বলে তারা শিক্ষা ভবনের কাছে এসে সচিবালয়ের দিকে যাওয়া শুরু করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সচিবালয় তো এমনিতেই প্রটেকটিভ এরিয়া। এখানে ১৪৪ ধারা সব সময় জারি থাকে। আমরা সচিবালয়ের সামনে এলাও করতে পারি না। পরে আমরা শিক্ষা ভবন মোড়ে তাদের আটকে দিয়েছি। ছেলেরা চলে গেলেও মেয়েরা শিক্ষা ভবন মোড়েই বসে পড়েন। তাদের পানি মারা হলেও সেখানেই অবস্থান করেন। এরপর আমরা হালকা কাঁদানে গ্যাস দিই, যা তাদের চোখে লাগে। এরপর সবাই সেখান থেকে উঠে যান।’