ছয় বছরেও শেষ হয়নি বিচার

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার বিচার শেষ হয়নি ছয় বছরেও। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ওই আগুনের ঘটনায় নারী-পুরুষ-শিশুসহ ৭১ জন মারা যায়। আহত হয় শতাধিক মানুষ। পরে নিহত জুম্মানের ছেলে আসিফ আহমেদ বাদী হয়ে ভবন মালিকসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। কিন্তু এখনো বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় নিহত স্বজনদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। এমনকি বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আসামিরা।

এদিকে এত বড় ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরও পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরানো হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দাপিয়ে ব্যবসায়ী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। এলাকার লোকজন ঝুঁকির মধ্যেই বসবাস করছেন।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জের ২০ একর জায়গায় পল্লী স্থাপন করার কথা ছিল। কিন্তু অল্পকিছু জায়গায় নামকাওয়াস্তে কেমিক্যাল কারখানা সরানো হলেও বেশিদিন টেকেনি। এসব স্থান নির্ধারণ নিয়ে নয়ছয়ের ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কারণে গুদাম সরানো যাচ্ছে না। আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, ইসলামপুর, চানখাঁরপুলসহ আশপাশ এলাকার আবাসিক ভবনে গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ গুদামগুলো। এসব গুদাম ও কারখানার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই। তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি। ইসলামবাগেই আছে ছোট-বড় কয়েকশ কেমিক্যাল, পলিথিন ও প্লাস্টিক তৈরির কারখানা। ভবনের মালিকরা বেশি ভাড়া পাওয়ার লোভে বাসার পরিবর্তে গুদাম বা কারখানা হিসেবে ভাড়া দিচ্ছেন। অনেক স্থানে ভবন জুড়েই রয়েছে গুদাম। যেসব কারখানা সরাতে হবে, তার একটি তালিকাও করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির নির্দেশ উপেক্ষা করে বহাল তবিয়তে ব্যবসা কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা।

অভিযোগ উঠেছে, কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক নেতাদের বলয়ে থাকার কারণে তাদের সরানো যাচ্ছে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতাও। চুড়িহাট্টা ও নিমতলী ট্র্যাজেডির পর সিটি করপোরেশন, শিল্প মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। কেমিক্যাল কারখানার তালিকা গত সরকারের মন্ত্রিসভায়ও জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানান্তরে আলোর মুখ দেখেনি। যদিও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, পুরান ঢাকায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসাবাড়িতেই।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঘটনার ছয় বছর পর স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে চুড়িহাট্টা। ওয়াহেদ ম্যানশনও মেরামত করে বাণিজ্যিকভাবে চালু করা হয়েছে। তবে স্বজনহারা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ক্ষত। অগ্নিকাণ্ডে সহায়-সম্বলহারা পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি আজও। তারপরও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে জনজীবন। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার বিন্দুমাত্র রেশ বোঝার উপায় নেই। ওয়াহিদ ম্যানশনের পুরো ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। মেরামত করা হয়েছে আশপাশের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোও।

এলাকাবাসী দেশ রূপান্তরকে জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে গণশুনানি হয়। গণশুনানিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র সাইদ খোকন বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্য থেকে ২১টি পরিবারের সদস্যকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক মাস্টাররোল পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি, চারটি পরিবারের মধ্যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ লাখ টাকার চেক ও দুটি পরিবারকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার জন্য কাগজ দেয়। কিন্তু কোনো কিছুই পাননি কেউ। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

এলাকাবাসী আরও জানায়, আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়েছেন। তারা দেদার ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিচার কবে শেষ হবে, তা কেউ জানেন না।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টায় পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চুড়িহাট্টা মোড়ে। মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত হয় পুরো এলাকা। আগুনের সূত্রপাত হওয়া হাজি ওয়াহিদ ম্যানশনের দোতলায় থেকে বুলেটের মতো ছুটে বের হতে থাকে আমদানি করা বিদেশি সব সুগন্ধির (বডি স্প্রে) ধাতব বোতল। মোড়ের তিনটি সড়কের অনেক দূর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রিকশা, ভ্যান পিকআপভ্যান, প্রাইভেট কারÑ সবই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে লাগা ওই আগুন জ¦লতে থাকে পরদিন সকাল পর্যন্ত। এ ঘটনায় মারা যায় পথচারীসহ ৭১ জন, আহত হয় শতাধিক।

ঘটনার তদন্ত শুরু করে ফায়ার সার্ভিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনসহ পাঁচটি সংস্থার তদন্ত কমিটি। তদন্ত শেষে সব প্রতিবেদনেই আগুনের সূত্রপাত হাজি ওয়াহিদ ম্যানশনের দোতলায় স্প্রে (কেমিক্যাল) গোডাউন থেকে হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। চার্জশিটে ভবন মালিক দুই ভাই মোহাম্মদ হাসান সুলতান, হোসেন সুলতানসহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। দুই ভাই ছাড়াও চার্জশিটে রাসায়নিকের গুদাম পার্ল ইন্টারন্যাশনালের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, পরিচালক মোজাম্মেল ইকবাল, ম্যানেজার মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মো. নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফের নাম ছিল। এর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের গুদামে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ১২৪ জন মারা যায়।