সাবেক আইজিপি শহীদুলের অবৈধ সম্পদের নথি উদ্ধার

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক টিম জানতে পারে শহীদুল হক গোপনে তার সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র স্বজনদের কাছে সরিয়ে দিয়েছেন। দুদক বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে। দুদকের সহকারী পরিচালক রাকিবুল হায়াতের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি দল এ অভিযান চালায়।

দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, শহীদুল হকের এক আত্মীয়বাড়ি থেকে বিভিন্ন ধরনের রেকর্ডপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব রেকর্ডপত্রে কী কী আছে তা পর্যালোচনা করা সময়সাপেক্ষ বিষয়।

দুদকের জনসংযোগ বিভাগ পাঠানো এ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুদকের অভিযানে দুটি বস্তা থেকে ৩৮টি বিভিন্ন ধরনের নথিপত্রসহ মোট ৪৮টি আলামত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে- সম্পত্তির দলিল, গোপনীয় চুক্তিপত্র, চুক্তির নথি, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কাগজপত্র, মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন, বন্ড, স্থায়ী আমানত (এফডিআর), অফার লেটার ও ব্যাংক হিসাব স্টেটমেন্ট। শহীদুল হক এসব কাগজপত্র দুটি বড় বস্তায় ভরে তার এক আত্মীয়ের কাছে পাঠান, যিনি পরে সেগুলো অন্য এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠান। দুদকের তথ্যমতে, এসব নথিতে অবৈধ উপায়ে অর্জিত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে দুদক কর্মকর্তারা রাত সাড়ে ১২টার দিকে এসব নথি জব্দ করেন। এসব জব্দ করা কাগজপত্র দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে কাজে আসবে। এগুলোর পর্যালোচনা করে ও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, শহীদুল হক তার ক্ষমতা ও পদ ব্যবহার করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন, যা পরবর্তীতে তার পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করেছেন। একজন সরকারি চাকরিজীবীর পরিবারের সদস্যদের এমন লেনদেন অস্বাভাবিক হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। পরে সংস্থাটি বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি প্রতিবেদন পাঠায়।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, সাবেক আইজিপি শহীদুল হক ও তার স্ত্রী-সন্তান এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মজিদ-জরিনা ফাউন্ডেশনের নামে ৭২টি ব্যাংক হিসাবে ৫৬০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তাদের নামে বেশি দামে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ফ্লোর স্পেস ও ফ্ল্যাট থাকারও তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে একটি ফ্ল্যাট উপহার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের তথ্য বলছে, শহীদুল হক ও তার পরিবারের সদস্যদের হিসাবে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৬০ কোটি ২৮ লাখ টাকা জমা হয়। যার মধ্যে ৫৫০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১০ কোটি ২০ লাখ টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। এ ছাড়া শহীদুল হকের একটি ঋণ হিসাবে মোট ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জমা হলেও ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এ হিসাবে তার বর্তমানে ১১ লাখ টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। তার স্ত্রী শামসুন্নাহার রহমানের দুটি বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে ২ লাখ ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার জমা হয়, যার মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার ডলার তোলা হয়েছে।

দুদকের তথ্য বলছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এক হিসাবে ১ কোটি ৬৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা করে শহীদুল হক একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। এরপর নিয়মিত ভাড়া বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ জমা হতে থাকে। এই ব্যাংক থেকেই তিনি ৪ হাজার ৫৭১ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট উপহার পান, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরে, একই ফ্ল্যাট ব্যাংকের কাছেই ভাড়া দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করেন। এ ছাড়া পদ্মা ব্যাংকের এক হিসাবে তার নামে ১৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জমা হয়, যার মধ্যে ১৪ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। অর্থ উত্তোলনের কাজে সানিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম ঢালি ও ইমরান ব্যাপারীসহ কয়েকজনকে ব্যবহার করা হয়। মেসার্স ইরা বিল্ডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করা হয়, যা শহীদুল হকের পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান। শহীদুল হক ও তার স্ত্রীর নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেস রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

দুদকের তথ্য বলছে, শহীদুল হকের বাবা-মায়ের স্মৃতিতে মজিদ-জরিনা ফাউন্ডেশন নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এক হিসাবে ফাউন্ডেশনের নামে ৭৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে। অথচ এটি শুধুমাত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত। এই হিসাবে বিভিন্ন জেলা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ একসঙ্গে জমা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা নগদ উত্তোলন করা হয়েছে। এ হিসাব থেকে শহীদুল হকের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ইরা বিল্ডার্সের হিসাবেও অর্থ পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, শহীদুল হক ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর শহীদুল হক গ্রেপ্তার হন। তার গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে তার নিজ বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের নরকলিকাতা ও চান্দনী এলাকার মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে, মুখ খুলছেন শরীয়তপুরবাসী। ভুক্তভোগীরা তার উপযুক্ত শাস্তি চান। তারা বলেন, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক বনেছেন। এলাকায় মজিদ জরিনা ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ করতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের জমিজমা জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন। কাউকে নামমাত্র টাকা দিলেও অনেকের জমির টাকা দেননি। জমি রেজিস্ট্রি ছাড়াই ইমারত নির্মাণ করার অভিযোগ রয়েছে।