মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে যুদ্ধকালীন সহায়তা দেওয়ার বিনিময়ে একটি খনিজ চুক্তির প্রস্তাব দিলে প্রাথমিকভাবে দেশটি তা নাকচ করেছে। বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাখোশ করেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধকালীন সহায়তা দিয়েছে, তা শোধ করার জন্য দেশটি ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের ভাগাভাগি বিষয়ক একটি চুক্তি করতে চাইলেও বুধবার জেলেনস্কি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেয়নি বলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুসারে, এক সপ্তাহ আগে খনিজ, তেল, গ্যাস এবং বন্দরসহ কিছু মূল সংস্থান থেকে মার্কিন সরকারকে ৫০ শতাংশ রাজস্ব প্রদানের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন প্রাথমিকভাবে ইউক্রেনকে প্রস্তাব করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এবং রাশিয়ার ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসনের পর থেকে প্রায় তিন বছরের যুদ্ধের আরও জটিল সময়ে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হলো। ইউক্রেনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি যখন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট কিয়েভ সফর করেন তখন জেলেনস্কির দলকে প্রায় কোনো সতর্কতা ছাড়াই প্রাথমিক নথি উপস্থাপন করা হয়েছিল যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বলা হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন দেশটিকে একটি শোষণমূলক চুক্তিতে বেঁধে ফেলতে চাইছে। সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, প্রাথমিক প্রস্তাবে ইউক্রেনের জন্য ভবিষ্যতের কোনো নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কথা নেই। এর মানে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই যুদ্ধ বাবদ খরচ করা অর্থের বিনিময়ে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের হিস্যা চাইছে।
চুক্তিটি স্বাক্ষর না করার কথা শুনে ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ইতিমধ্যেই স্বৈরাচার আখ্যা দিয়েছেন এবং তার ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট হওয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জেলেনেস্কি মনে করেন, ট্রাম্প ‘অপতথ্যের ফাঁদে’ আটকা পড়ে আছেন। ‘আমি তাদের নিরাপত্তা গ্যারান্টিগুলো দেখাতে বলেছিলাম এবং তারপর আমরা শতাংশের বিষয়ে কথা বলি। তারা ৫০ শতাংশ বলেছিল এবং আমি উত্তর দিয়েছিলাম না। আমি দেশটিকে বিক্রি করতে পারি না। আমি কেবল একজন ম্যানেজার। আগামীকাল, দেশের অন্য একজন ম্যানেজার থাকবে, তাই আমি এটি বিক্রি করতে পারব না। এ ছাড়া প্রায় ২০ শতাংশ সম্পদ রাশিয়া-অধিকৃত অঞ্চলে রয়েছে।’ ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জেলেনস্কি ইউএস ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সঙ্গে কিয়েভে দেখা করার কয়েক ঘণ্টা আগে, ইউক্রেনকে তার সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে তাদের ৫০ শতাংশ রাজস্ব দিতে সম্মত হওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাবিত চুক্তি পাঠানো হয়েছিল। জেলেনস্কি এবং তার দলের কাছে নথিটি পর্যালোচনা করার প্রায় কোনো সময় না দিয়েই সেদিনের বৈঠকে তাদের স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে।
এর দুদিন পরে জার্মানির মিউনিখে জেলেনস্কির সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিওর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু জেলেনস্কি বৈঠকের আগে একটি সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানোর পর, ভ্যান্স এবং রুবিও তা বাতিল করার হুমকি দেন। এরপর জেলেনস্কির সঙ্গে থাকা দলের পক্ষ থেকে তাদের প্রথমে এটি পড়তে বলে সভাটি চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে বলে ইউক্রেনের তরফে জানা যায়। অবশ্য, মার্কিন তরফে এই ধরনের বিবরণ অস্বীকার করা হয়। ইউক্রেন জানিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে সে দিনের বৈঠকের কোনো ছবি বা ভিডিও করতে দেওয়া হয়নি। সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ নির্দেশিত এক নথিতে দেখা যায় যে, ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে যে বিপুল যুদ্ধ সহায়তা দিয়ে আসছে, তার বিনিময়ে দেশটির খনিজ ও তেল সম্পদ এবং বন্দরের হিস্যা দাবি করে। ট্রাম্পের কথার প্রতিধ্বনি করে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের অনন্য শীর্ষ কর্মকর্তারাও উষ্মা প্রকাশ করেছেন। ‘দেখুন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টতই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ওপর এই মুহূর্তে খুব হতাশ। বাস্তবতা হলো যে, তিনি টেবিলে আসেননি যে, তিনি এই সুযোগটি নিতে ইচ্ছুক নন, যেটি আমরা প্রস্তাব করেছি। আমি মনে করি তিনি শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থানে পৌঁছে যাবেন এবং আমি আশা করি খুব দ্রুত।’ বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে এক ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ওয়াল্টজ এ কথা বলেন। ‘আমার দৃষ্টিতে, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করার চেয়ে ভালো আর কিছুই হতে পারে না,’ ওয়াল্টজ বলেন।
জেলেনস্কি ও ইউক্রেন বর্তমানে ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি, রাশিয়ান জেনারেল কিথ কেলগের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা আশা করছেন যে, এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তারা সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারবেন। ‘ইউক্রেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটি শক্তিশালী, কার্যকর বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা চুক্তির জন্য প্রস্তুত। আমরা ফলাফল অর্জনের দ্রুততম এবং সবচেয়ে গঠনমূলক উপায় প্রস্তাব করেছি। আমাদের দল ২৪/৭ কাজ করার জন্য প্রস্তুত।’ আশাবাদ ব্যক্ত করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তবে যুদ্ধ সম্পর্কে ট্রাম্পের মন্তব্য ইউরোপে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মহাদেশটির নেতারা বলেছেন যে, তারা যুদ্ধের বিষয়ে ভুল আচরণ করেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে সন্দেহ করেছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় নিরাপত্তায় অনেক বেশি অবদান রাখে এবং এর বেশি বোঝা ইউরোপীয় দেশগুলোকে বহন করতে হবে। এ ছাড়াও ট্রাম্প বলেছেন, তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চান এবং এই লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তাকে সৌদি আরবে প্রেরণ করেছেন। বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স ট্রাম্পকে ‘কার্যকরী আপস মীমাংসাকারী’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তিনি কিছুই আলোচনা থেকে খারিজ করেন না। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, তিন বছরের মধ্যে ইউরোপে প্রথমবারের মতো শান্তি ফিরে আসবে।
লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক
faizbsu002@gmail.com