বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়ংকর কালসময়, ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি। এদিন ঢাকার পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল কিছু বিপথগামী সৈনিক। সেই পৈশাচিক উন্মত্ততার শিকার হয়ে প্রাণ হারান তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ সেনা কর্মকর্তা। এ ছাড়া নারী ও শিশুসহ আরও ১৭ জন নিহত হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনী এবং আনসার বাহিনীতে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিডিআর বিদ্রোহ ঘটনার নৃশংসতা ছিল ভয়ংকর। এর ফলে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সৈনিক এবং অফিসারদের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক। সেনাবাহিনী ও তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের পরিবারের অনেকে পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ঘটনাটিকে ‘বিডিআর বিদ্রোহ’ বলতে চান না। তাদের মতে, পুরো বিষয়টিই ছিল ‘ষড়যন্ত্র’।
২০১৭ সালে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছিল ২২৮ জনের। তখন খালাস দেওয়া হয় ২৮৩ জনকে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছিল ২০২০ সালে। এরপর অভিযুক্ত অনেকেই পালিয়ে বিদেশ চলে যান। কেউ কেউ বলছেন ‘বাংলাদেশের ওপর আধিপত্যবাদী শক্তির দখলদারিত্ব কায়েমের জন্য আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশই ছিল পিলখানা হত্যাযজ্ঞ। এটি কোনো বিদ্রোহ ছিল না, ছিল পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ।’ এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরির বিআরআইসিএম ভবনে ‘বিডিআর বিদ্রোহে হত্যাকা-’ সম্পর্কিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন তথ্য জানিয়েছেন কমিশন সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান। তিনি বলেছেন পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় তথ্যগত সহায়তা ও ঘটনায় জড়িত পলাতক আসামিদের অবস্থান জানতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি দূতাবাসে চিঠি দিয়েছে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। তদন্ত কমিশন বলছে, গত জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। কে কোথায় আছেন, সে বিষয়ে কমিশন নিশ্চিত নয়। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের তদন্তের স্বার্থে অনেককে প্রয়োজন। এই ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিডিআর সদর দপ্তরে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় সেনাসদস্যসহ ৩৭ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে তদন্ত কমিশন। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়েছে। সন্দেহজনকদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, ‘এ ঘটনার তদন্তে আমরা যাদের প্রয়োজন মনে করছি, তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কারণ যেকোনো সময় যে কাউকে জিজ্ঞাসার প্রয়োজন হতে পারে। সময়মতো তাদের যেন কাছে পাই। তবে তাদের সংখ্যা বলছি না।’ জেনারেল মইনসহ যাদের সাক্ষ্য জরুরি, তাদের সঙ্গে যেভাবেই হোক যোগাযোগ করে বিচার সম্পন্ন করাই মূল চ্যালেঞ্জ। তবে ৯০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন খোদ কমিশন সভাপতি। তিনি বলছেন ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দিতে চেষ্টা করছি। তবে দুটি বাধার মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ, অন্যটি বিদেশে পলাতকদের কানেক্ট (সংযোগ) করা, জিজ্ঞাসাবাদ করা। অভ্যন্তরীণটা সহজেই সম্ভব, কিন্তু বিদেশে পলাতকদের বিষয়টি কঠিন। সেজন্য বাড়তি সময় লাগতে পারে।’
আগের বিচারপ্রক্রিয়ায় যে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ রয়েছে, পুনরায় তদন্তের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিবেচনা যেন না আসে এবং সত্যিকার অর্থেই যারা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত সেটা সঠিকভাবে সামনে নিয়ে আসাই চ্যালেঞ্জ। ন্যায়বিচার নিশ্চিতে এখন নতুন মাত্রা যুক্ত হবে কি না, সেটাই প্রশ্ন। আইনের ভাষায় দুটি কথা আছে ‘জাস্টিস হারিড, জাস্টিস বারিড’ আর ‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড’। মামলার বিচারকাজ দ্রুত হলেও ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হতে পারে। আবার দেরি হলেও বিচারপ্রার্থী বঞ্চিত হতে পারেন। সরকারকে যে কোনো উপায়ে দ্রুতগতিতে মামলার বিচার শেষ করতে হবে। অপরাধীকে দিতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। স্বজন হারানোরা যাতে অপরাধীদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর দেখতে পান। আবার অভিযুক্তরা যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন। ষড়যন্ত্রকারী পিশাচকুল নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে উপযুক্ত শাস্তি পাবে এটাই প্রত্যাশা।